মুহাম্মদ (সঃ) জীবনী

নূরে মোহাম্মদীর (সঃ) সৃষ্টি রহস্য ও প্রকৃতি

অনাদি ও অনন্ত স্বত্বা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যখন একা ও অপ্রকাশিত ছিলেন, তখন তাঁর আত্মপ্রকাশের সাধ ও ইচ্ছা জাগরিত হলো । তখন তিনি একক সৃষ্টি হিসেবে নবী করিম (সঃ) এর নূর মোবারক পয়দা করলেন এবং নাম রাখলেন মোহাম্মদ (সঃ) । (কাঞ্জুদাকায়েক – ইমাম গাযালী (রহঃ)

সেই নূরে মোহাম্মদীর সৃষ্টি হিসেবে নবী করিম (দঃ) মারফু মুত্তাসিল হাদিসের মাধ্যমে পরিস্কার ব্যাখ্যা করে গেছেন । উক্ত হাদীসটি বর্নিত হয়েছে রাসূলে পাক (সঃ)-এর একান্ত একনিষ্ঠ খাদেম ও মদিনার ৬ নং সাহাবী হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) কর্ত্রিক । উক্ত হাদীসটি প্রথম সঙ্কলিত হয়েছে “মোসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক” নামক হাদীসগ্রন্থে । মোহাদ্দেস আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন ইমাম বোখারী (রহঃ)-এর দাদা ওস্তাদ এবং ইমাম মালেকের শাগরিদ ।

পরবর্তীতে উক্ত গ্রন্থ হতে অনেক হাদীস বিশারদগণ নিজ নিজ গ্রন্থে হাদীসখানা সঙ্কলিত করেছেন । যেমন- ইমাম কাস্তুলানী (রহঃ) তাঁর রচিত নবী করিম (সঃ) এর জীবনী গ্রন্থ ‘মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া’ তে উক্ত হাদীসখানা উল্লেখ করেছেন । নবী করিম (দঃ)-এর সৃষ্টি সম্পর্কে এই হাদীসখানা সুবিখ্যাত এবং বিস্তারিত । তাই বিজ্ঞ পাঠকদের সামনে আমরা উক্ত হাদীসখানা অনুবাদসহ তুলে ধরছি । এ রেওয়ায়েত ছাড়া অন্যান্য রেওয়ায়াত অসম্পূর্ণ, অস্পষ্ট ও খন্ডিত এবং উসুলে হাদীসের মাপকাঠিতে অনির্ভরযোগ্য বা মারজুহ্‌ । হাদীসখানা নিম্নরুপঃ

ইমাম আবদুর রাজ্জাক (ইমাম বোখারীর দাদা ওস্তাদ) মোয়াম্মার হতে, তিনি ইবনে মুন্কাদার হতে, তিনি হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন: হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আপনার উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গীত হোক, আল্লাহ তায়ালা সমস্ত বস্তুর পূর্বে সর্বপ্রথম কোন্ বস্তু সৃষ্টি করেছেন?

তদুত্তরে নবী করিম (দঃ) বললেন “হে জাবের, আল্লাহ তায়ালা সমস্ত বস্তুর পূর্বে সর্বপ্রথম তাঁর ‘নিজ নূর হতে’ তোমার নবীর নূর পয়দা করেছেন। তারপর আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছানুযায়ী ঐ নূর (লা-মাকানে) পরিভ্রমণ করতে থাকে। কেননা ঐ সময় না ছিল লাওহে-মাহফুজ, না ছিল কলম, না ছিল বেহেস্ত, না ছিল দোযখ, না ছিল ফিরিস্তা, না ছিল আকাশ, না ছিল পৃথিবী, না ছিল সূর্য, না ছিল চন্দ্র, না ছিল জ্বীন জাতি, না ছিল মানবজাতি।

অতঃপর যখন আল্লাহ্ তায়ালা অন্যান্য বস্তু সৃষ্টি করার মনস্থ করলেন-তখন আমার ঐ নূরকে চারভাগে বিভক্ত করে প্রথম ভাগ দিয়ে কলম, দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে লাওহে-মাহফুয এবং তৃতীয় ভাগ দিয়ে আরশ সৃষ্টি করলেন।

অবশিষ্ট এক ভাগকে আবার চার ভাগে বিভক্ত করে প্রথম ভাগ দিয়ে আরশ বহনকারী ফিরিস্তা, দ্বিতীয় অংশ দিয়ে কুরসি এবং তৃতীয় অংশ দিয়ে অন্যান্য ফিরিস্তা সৃষ্টি করলেন।

দ্বিতীয় চতুর্থ ভাগকে আবার চার ভাগে বিভক্ত করে প্রথমভাগ দিয়ে আকাশ, দ্বিতীয়ভাগ দিয়ে জামিন (পৃথিবী) এবং তৃতীয় ভাগকে দিয়ে বেহেস্ত ও দোযখ সৃষ্টি করলেন।

তৃতীয়বার অবশিষ্ট ভাগকে পুনরায় চার ভাগে বিভক্ত করে প্রথমভাগ দিয়ে মোমেনদের নয়নের নূর-(অন্তর্দৃষ্টি), দ্বিতীয়ভাগ দিয়ে মুমিনদের কলবের নূর-তথা আল্লাহর মা’রেফাত এবং তৃতীয়ভাগ দিয়ে মুমিনদের মহব্বতের নূর-তথা তাওহীদী কালেমা ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ সৃষ্টি করেছেন।” (২৫৬ ভাগের এক ভাগ থেকে অন্যান্য সৃষ্টিজগত পয়দা করলেন)।

— মাওয়াহেব লাদুনি্নয়া ও মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক- (আল জুযউল মাফকুদ অংশ)

ব্যাখ্যাঃ

উক্ত হাদীসে বর্ণিত “মিন-নূরিহী” বা তার “নিজ নূর” হতে শব্দটির ব্যাখ্যায়

  • বিশ্ব বিখ্যাত আল্লামা হযরত মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) মিরকাত শরীফে লিখেছেন- “আয়-মিন লামআতে নূরিহী”- অর্থাৎ- আল্লাহ তায়ালা তার আপন যাতি নূরের জ্যোতি দিয়ে নবীজীর নূর সৃষ্টি করেছেন।

  • মুজাদ্দেদে আলফেসানী (রহঃ) মাকতুবাত শরীফের ৩য় খন্ড ১০০ নম্বরের মাকতুবে বলেছেন “আল্লাহ তায়ালা তাহাকে স্বীয় খাস নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন”।

  • হযরত যারকানী (রহঃ) “মিন-নূরিহী” এর ব্যাখ্যায় বলেছেন – “মিন নূরিন হুয়া যাতুহু” অর্থাৎ আল্লাহর যাত বা স্বত্বা হলো নূর-সেই যাতি নূরের জ্যোতি হতেই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নূরের সৃষ্টি” এবং

  • হযরত আশরাফ আলী থানবীও একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার “নশরুত ত্বীব” গ্রন্থের ৫ম পৃষ্ঠায়।

অন্য এক হদীসে হযরত আলী ইবনে হোসাইন ইবনে আলী (রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) তার পিতা ও দাদার সূত্রে নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন

আমি আদম সৃষ্টির চৌদ্দ হাজার বৎসর পূর্বে আমার প্রতিপালকের নিকট নূর হিসেবে বিদ্যমান ছিলাম।

উল্লেখ্য

ঐ জগতের একদিন পৃথিবীর এক হাজার বৎসরের সমান। অংকের হিসাবে ৫১১০০০০০০০ বৎসর হয়। (বিদায়া ও নিহায়া এবং আনওয়ারে মুহাম্মাদীয়া গ্রন্থসূত্রে এই হাদীসখানা উদ্ধৃত করা হয়েছে।)

তাফসীরে রুহুল বয়ানে সূরা তাওবার আয়াত

‘লাক্বাদ জা আ কুম রাসুলুম্মিন আনফুসিকুম’

অর্থ “তোমাদের নিকট এক মহান রাসূলের আগমন হয়েছে”

এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে নবী করিম (সঃ) কোথা হতে আসলেন- সে সম্পর্কে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে নিম্নোক্ত হাদীস বর্ননা করা হয়েছেঃ

একদিন নবী করিম (দঃ) কথা প্রসঙ্গে হযরত জিব্রাইল (আঃ)কে তাঁর বয়স সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন- হে জিব্রাইল ! তোমার বয়স কত ? তদুত্তরে জিব্রাইল (আঃ) বললেন- আমি শুধু এতটুকু জানি যে, নূরের চতুর্থ হিজাবে একটি উজ্জ্বল তারকা ৭০ হাজার বৎসর পর পর একবার উদিত হতো । (অর্থাৎ সত্তর হাজার বৎসর উদিত অবস্থায় এবং সত্তর হাজার বৎসর অস্তমিত অবস্থায় ঐ তারকাটি বিরাজমান ছিল) । আমি ঐ তারকাটিকে ৭২ হাজার বার উদিত অবস্থায় দেখেছি । তখন নবী করিম (সঃ) বললেন- “খোদার শপথ, আমিই ছিলাম ঐ তারকা” ।

— তাফাসীরে রুহুল বয়ান, ৩য় খন্ড ৫৪৩ পৃঃ সূরা তাওবা এবং সীরাতে হলবিয়া, ১ম খন্ড ৩০ পৃষ্ঠা

নবী করিম (দঃ) এর এই অবস্থানের সময় ছিলো ঐ জগতের হিসাবে একহাজার আট কোটি বৎসর । পাঁচশত চার কোটি বৎসর ছিলেন উদীয়মান অবস্থায় এবং পাঁচশত চার কোটি বৎসর ছিলেন গায়েবী অবস্থায় । দুনিয়ার হিসাবে কত হাজার কোট বৎসর হবে- তা আল্লাহ্‌-ই জানেন । হযরত জিব্রাঈল (আঃ) শুধু দেখেছেন হুযুরের বাহ্যিক রুপ । বাতেনী দিকটি ছিল তাঁর অজানা ।

রাসূল করীম (সঃ) এর সৃষ্টি রহস্য এত গভীর যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেহই প্রকৃত অবস্থা জানেনে । দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা কাসেম নানুতবী সাহেব নবী করিম (সঃ) এর বাহ্যিক আবরণের ভিতরে যে প্রকৃত নূরানী রুপটি লুক্কায়িত ও রহস্যাবৃত রয়েছে, তা মুক্তকন্ঠে স্বীকার করেছেন এভাবেঃ

হে প্রিয় নবী (সঃ)! আপনার প্রকৃত রুপটি তো বশরিয়তের আবরনে ঢাকা পড়ে আছে । আপনাকে আপনার প্রভু (ছাত্তার) ছাড়া অন্য কেহই চিনতে পারেনি ।

এখানে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, রাসূল করীম (সঃ) এর রুপ বা অবস্থা তিনটি । যথা- ছুরতে বাশারী, ছুরতে মালাকী ও ছুরতে হক্কী । (তাফসীরে রুহুল বয়ান ও তাফসীরে কাদেরী) । সাধারণ মানুষ শধু দেখতে পায় বশরী ছুরতটি । অন্য দুটি ছুরত বা অবস্থা খাস লোক ছাড়া দেখা বা অনুধাবন করা সম্ভব নয় ।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

নবী করিম (দঃ) এর দেহ মোবারক নূর নাকি মাটি ?

সাহাবী জাবের (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত মরফু হাদীস- অর্থাৎ স্বয়ং নবী করিম (সঃ)-এর জবানে বর্ণিত হাদীস দ্বারা হুযুর (দঃ) নূরের সৃষ্টি বলে প্রমাণিত হয়েছে। মাটি, পানি, আগুন, বায়ু- এই উপাদান চতুষ্টয় যখন পয়দাই হয়নি, তখন আমাদের প্রিয় নবী (সঃ) পয়দা হয়েছেন। সুতরাং তিনি যে মাটির সৃষ্টি নন এবং মাটি সৃষ্টির পূর্বেই পয়দা- একথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হলো।

কিন্তু আমলে নাছুত- অর্থাৎ পৃথিবীতে আত্মপ্রকাশের সময় যে বশরী সুরত বা মানব শরীর ধারণ করেছেন, তা কিসের তৈরি- এ নিয়ে বিভিন্ন মতামত লক্ষ্য করা যায়। যেমন- তাবেয়ী হযরত কা’বে আহবার (রহঃ) এবং সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত কথিত দুটি হাদীস বা রেওয়ায়াতে দেখা যায় যে, নবী করিম (সঃ)-এর দেহ মোবারক মদিনা শরীফের রওযা মোবারকের খামিরা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

এ দু’খানা রেওয়ায়াতকে পুঁজি করে একদল ওলামা বলেন- হুযুর (সঃ) মাটির তৈরি। বাতিলপন্থী কোনো কোনো আলেম আবার ঠাট্টা করে বলেন- তিনি তো সাদা মাটির তৈরি (নাউযুবিল্লাহ)। জনৈক মাওলানা মুহাম্মদ ফজলুল করিম রচিত ‘তাওহীদ রিসালাত ও নূরে মোহাম্মদী সৃষ্টি রহস্য’ নামক বইখানা দ্রষ্টব্য। উক্ত বইয়ে আল্লাহকেও নূর বলে অস্বীকার করা হয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ)।

আবার সহি রেওয়ায়াতে দেখা যায় যে, হুযুর (দঃ) নূর হয়েই আদম (আঃ)-এর সাথে জগতে তাশরীফ এনেছেন এবং আল্লাহর কুদরতে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঐ নূর এক দেহ হতে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হতে হতে অবশেষে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর পৃষ্ঠ হতে ঐ পবিত্র নূর সরাসরি হযরত আমেনা (রাঃ)-এর গর্ভে স্থান লাভ করেছেন এবং যথাসময়ে নূরের দেহ ধারণ করে মানব আকৃতি নিয়ে দুনিয়াতে তাশরীফ এনেছেন।

পর্যালোচনা

উক্ত দুই মতবাদের মধ্যে কোন্টি সঠিক- তা যাচাই-বাছাই করলে দেখা যাবে যে, ইলমে হাদীসের নীতিমালার আলোকে দ্বিতীয় মতবাদটিই সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়। তাই প্রথমে মাটির রেওয়ায়াত দুটি উসুলে হাদিসের নীতিমালার আলোকে পর্যালোচনা করা দরকার। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণিত কথিত হাদীসখানা নিম্নরূপ :

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ (দঃ) বলেন- নবজাত প্রত্যেক শিশুর নাভিতে মাটির একটি অংশ রাখা হয়। সেখানেই সে সমাধিস্থ হয়। তিনি আরো বলেন- আমি, আবু বকর ও ওমর একই মাটি হতে সৃজিত হয়েছি এবং সেখানেই সমাধিস্থ হবো।

— তাফসীরে মাযহারী ও খতীবে বাগদাদীর আল মুত্তাফিক ওয়াল মুফতারিক

উক্ত হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে মোহাদ্দিসগণের মতামত

  • খতীবে বাগদাদী (রহঃ) এই রেওয়ায়াতটি তাঁর গ্রন্থে বর্ণনা করে বলেন- হাদীসটি গরীব। গরীব হাদীস বলা হয় প্রতি যুগে মাত্র একজন বর্ণনাকারীই উক্ত রেওয়ায়াতটি বর্ণনা করেছেন- দ্বিতীয় কোনো বর্ণনাকারী নেই। গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে গরীব হাদিস দ্বারা কোনো আইনী বিষয় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। (উসুলে হাদীস দ্রষ্টব্য)

  • হাদীস শাস্ত্র বিশারদ আল্লামা ইবনে জওযী বলেন- এই হাদীসটি মওযু ও বানোয়াট। এই দুটি মতামত মাআরেফুল কোরআন-এর বাংলা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, সৌদী আরব ছাপা, পৃষ্ঠা ৮৫৬-এ উল্লেখ করা হয়েছে। রেওয়ায়াত হিসেবে প্রত্যেক লেখকের কিতাবেই এটি পাওয়া যায়। কিন্তু-এর নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করেন হাদীসের জোরাহ ও তাদীল বিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ। ইবনে জওযীর মতামতের গুরুত্ব প্রত্যেক হাদীস বিশারদের নিকটই স্বীকৃত।

সুতরাং একটি গরীব, জাল, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট রেওয়ায়াতের উপর নির্ভর করে রাসুলে পাকের (সঃ) দেহ মোবারককে মাটির দেহ বলা যে অসঙ্গত- তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। জাল হাদীস তৈরিতে রাফেযী ও বাতিল ফের্কাগুলি ঐ যুগে তৎপর ছিল। তারা সাহাবী ও তাবেয়ীগণের নাম ব্যবহার করে ভিত্তিহীন হাদীস তৈরি করতো।

কা’ব আহবারের রেওয়ায়াত বিশ্লেষণ

হযরত কা’ব আহবার (তাবেয়ী) বলেন : যখন আল্লাহ পাক হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)কে (দেহকে) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি জিবরাইল (আঃ) কে এমন একটি খামিরা নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ করলেন- যা ছিল পৃথিবীর কলব, আলো ও নূর (মাটি নয়)।

এই নির্দেশ পেয়ে জিবরাইল (আঃ) জান্নাতুল ফেরদাউস এবং সর্বোচ্চ আসমানের ফিরিস্তাদের নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করলেন। অতঃপর রাসুলে পাকের রওযা শরীফের স্থান থেকে এক মুষ্ঠি খামিরা নিয়ে নিলেন। উহা ছিল সাদা আলোময় নূর। পরে উক্ত খামিরাকে বেহেস্তে প্রবাহিত নহর সমূহের মধ্যে তাছনীম নামক নহরের পানি দিয়ে গুলিয়ে সেটি এমন একটি শুভ্র মুক্তার আকার ধারণ করলো, যার মধ্যে ছিল বিরাট আলোশিখা। অতঃপর ফিরিস্তারা প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে উক্ত মুক্তা আকৃতির আলোময় খামিরা নিয়ে আরশ, কুরছি, আসমান-জমিন, পাহাড়-পর্বত ও সাগর-মহাসাগরের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করলেন। এভাবে ফিরিস্তাকুল ও অন্যান্য সকল মাখলুক হযরত আদম (আঃ)-এর পরিচয় পাওয়ার পূর্বেই আমাদের সর্দার ও মুনিব হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর ফযিলত সম্পর্কে পরিচিতি লাভ করলো। (মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া)

হাদীসখানার পর্যালোচনা

উপরোক্ত কা’ব আহবার (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতখানার বিচার বিশ্লেষণ করলে নীচের জ্ঞাতব্য বিষয়গুলো বের হয়ে আসে। যথা-

১) কা’ব আহবার (রাঃ) পূর্বে একজন বড় ইহুদী পণ্ডিত ছিলেন। রাসুলের (সঃ) যুগে তিনি মুসলমান হননি। সুতরাং সাহাবী নন। তিনি হযরত ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে মুসলমান হয়ে তাবেয়ীনদের মধ্যে গণ্য হন। সাহাবীর বর্ণিত হাদীস রাসুলের জবান থেকে শ্রুত হলে তাকে মারফু মোত্তাসিল বলা হয়। আর রাসুলের সূত্র উল্লেখ না থাকলে সাহাবীদের বর্ণিত হাদীসকে মাওকুফ বলা হয়। তাবেয়ীর বর্ণিত হাদীস- যার মধ্যে সাহাবী ও রাসূলের সূত্র উল্লেখ নেই, তাকে বলা হয় মাকতু। উক্ত হাদীসখানা তাঁর নিজস্ব ভাষ্য। সাহাবী বা রাসুল বর্ণিত হাদীস নয়।

হাদীসের প্রত্যেক শিক্ষার্থীই এই সূত্র ভালোভাবে জানেন যে, তাবেয়ীর মাকতু হাদীস যদি রাসুলের বর্ণিত মারফু হাদীসের সাথে গরমিল বা বিপরীত হয়, তাহলে রাসূলের বর্ণিত মারফু হাদীসই গ্রহণযোগ্য হবে। কা’ব আহবারের খামিরার হাদীসখানা তাঁর নিজস্ব ভাষ্য এবং তৃতীয় পর্যায়ের। পূর্বে হযরত জাবেরের বর্ণিত নূরের হাদীসখানা ১ম পর্যায়ের। গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে ১ম পর্যায়ের হাদীসই অগ্রগণ্য। সুতরাং উসুলের বিচারে কা’ব আহ্বারের হাদীসখানা দুর্বল ও মোরসাল এবং সহী সনদেরও খেলাফ। সোজা কথায়- তাবেয়ীর বর্ণিত মাকতু হাদীস রাসূল বর্ণিত মারফু হাদীসের সমকক্ষ হতে পারে না।

২) আল্লামা যারকানী বলেন- কা’ব আহবার পূর্বে ইহুদী পণ্ডিত ছিলেন। সম্ভবতঃ তিনি পূর্ববর্তী কোনো গ্রন্থে ইসরাইলী বা ইহুদী বর্ণনার মাধ্যমে এই তথ্য পেয়ে থাকবেন। এই সম্ভাবনার কারণে ইসরাইলী বা ইহুদী বর্ণনা আমাদের শরীয়তে গ্রহণযোগ্য হবে না- যদি তা অন্য হাদীসের বিপরীত হয়। কা’ব আহ্বারের বর্ণিত হাদীসটি হযরত জাবেরের বর্ণিত হাদীসের পরিপন্থী। তাই ইহা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

৩) তদুপরি ত্বিনাত শব্দটির অর্থ মাটি নয়-বরং খামিরা। এই খামিরার ব্যাখ্যা করা হয়েছে পৃথিবীর কলব, আলো ও নূর-তথা নূরে মোহাম্মদী (যারকানী)। সুতরাং জিবরাইলের সংগৃহীত খামিরাটি মাটি ছিল না- বরং রওযার মাটিতে রক্ষিত নূরে মোহাম্মদীর খামিরা (যারকানী)। খামিরা সূরতের এই নূরে মোহাম্মদীকেই পরে বেহেস্তের তাছনীম ঝরনার পানি দিয়ে গুলিয়ে এটাকে আরো অনু-পরমাণুতে পরিণত করা হয়েছিল। যেমন পানি হতে বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়। তাই বলে বিদ্যুৎকে পানি বলা যাবে না। নবী করিম (সঃ)-এর দেহ মোবারক ছিল সৃষ্টি জগতের মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্মতম। এ মর্মে একখানা হাদীস মিলাদে মোহাম্মদী ও হকিকতে আহমদী নামক বাংলা গ্রন্থে উল্লেখ আছে। বইখানার লেখক ফুরফুরার খলিফা মেদিনীপুরের মরহুম মাওলানা বাশারাত আলী সাহেব। হাদীসখানা হচ্ছে-

রাসুল (সঃ) বলেন, আমরা নবীগণের শরীর হলো ফিরিস্তাদের শরীরের মত নূরানী ও অতিসূক্ষ্ম। তাইতো নবী করিম (সঃ) সূক্ষ্মতম শরীর ধারণ পূর্বক আকাশ ও ফিরিস্তা জগত, এমন কি আলমে আমর তথা আরশ-কুরছি ভেদ করে নিরাকারের দরবারে কাবা কাওছাইনে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। মাটির দেহ ভারী এবং তা লক্ষ্যভেদী নয়। মাটির শরীর হলে ভস্ম হয়ে যেতো।

উপরের দুখানা হাদীস পর্যালোচনা করলে ইবনে মাসউদ (রাঃ)- বর্ণিত প্রথম হাদীসখানা জাল এবং কা’ব আহ্বারের ভাষ্যটি ইসরাইলী বা ইহুদী সূত্রে প্রাপ্ত- যা সরাসরি হাদীসে মারফুর খেলাফ। তদুপরি- কা’ব আহবারের হাদীসখানায় বিভিন্ন তাবিল বা ব্যাখ্যা করার অবকাশ রয়েছে। ইহা মোহকাম বা সংবিধিবদ্ধ নয়। সুতরাং হযরত জাবের (রাঃ)-এর মারফু হাদীস ত্যাগ করে কাবে আহবারের বর্ণিত মাকতু রেওয়ায়াত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আবার নূর ও মাটির উভয় হাদীস গ্রহণ করে নবীজীর দেহ মোবারককে নূর ও মাটির সমন্বিত রূপও বলা যাবে না। যেমন- বলেছেন অনেক জ্ঞানপাপী মুফতী। হাদীসের বিশ্লেষণ না জানার কারণেই তারা এরূপ ফতোয়া দিয়েছেন। কা’ব আহবারের বর্ণিত খামিরাটি ছিল নূরে মোহাম্মদীর ঐ অংশ- যা দ্বারা দুনিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ঐ অংশই রওযা মোবারকের স্থানে রক্ষিত ছিল- (যারকানী দেখুন)।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

নূরের দেহ মোবারকের সমর্থনে দলিল

এবার আমরা নূরের দেহের পক্ষের কিছু রেওয়ায়াত পেশ করে প্রমাণ করবো নবী করিম (সঃ)-এর দেহ মোবারকও নূরের তৈরি ছিল। যথা-

(১) যারকানী শরীফ ৪র্থ খণ্ড ২২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে

সূর্য চন্দ্রের আলোতে নবী করিম (সঃ)-এর দেহ মোবারকের ছায়া পড়তেছেনা। কেননা, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক নূর

— যারকানী

(২) ইমাম কাযী আয়ায (রহঃ) শিফা শরীফের ১ম খণ্ড ২৪২ পৃষ্ঠায় লিখেনঃ

নূরের দলীল হিসেবে ছায়াহীন দেহের যে রেওয়ায়াতটি পেশ করা হয়, তা হচ্ছে-

দিনের সূর্যের আলো কিংবা রাতের চাঁদের আলো- কোনটিতেই হুযুরের (সঃ) দেহ মোবারকের ছায়া পড়তোনা। কারণ তিনি ছিলেন আপাদমস্তক নূর ।

— শিফা শরীফ

(৩) আশ্রাফ আলী থানবী সাহেব তার ‘শুকরুন্ নে’মাতি বিযিক্রি রাহমাতি’ গ্রন্থের ৩৯ পৃষ্ঠায় স্বীকার করেছেন-

একথা সর্বজন স্বীকৃত ও প্রসিদ্ধ যে, আমাদের হুযুর (সঃ)-এর দেহের ছায়া ছিল না। কেননা আমাদের হুযুর (দঃ) মাথা মোবারক হতে পা মোবারক পর্যন্ত শুধু নূর আর নূর ছিলেন।

— শোকরে নে’মত

(৪) ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী (রহঃ) আন-নে’মাতুল কোবরা গ্রন্থের ৪১ পৃষ্ঠায় হাদীস লিখেন

হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি রাত্রে বাতির আলোতে বসে নবী করিম (দঃ)-এর কাপড় মোবারক সেলাই করছিলাম। এমন সময় প্রদীপটি (কোন কারণে) নিভে গেল এবং আমি সুঁচটি হারিয়ে ফেললাম। এর পরপরই নবী করিম (সঃ) অন্ধকারে আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর চেহারা মোবারকের নূরের জ্যোতিতে আমার অন্ধকার ঘর আলোময় হয়ে গেল এবং আমি (ঐ আলোতেই) আমার হারানো সুঁচটি খুঁজে পেলাম।

সোবহানাল্লাহ। মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, নূরের চেহারা-আর তারা বলে মাটির চেহারা। নাউযুবিল্লাহ!

(৫) মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরী সাহেব তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন-

নবী করিম (দঃ) মায়ের গর্ভেই যে নূর ছিলেন- এর দলীল হচ্ছে যাকারিয়ার বর্ণিত হাদীস-নবী করিম (সঃ) নয় মাস মাতৃগর্ভে ছিলেন, এ সময়ে বিবি আমেনা (রাঃ) কোনো ব্যথা বেদনা অনুভব করেননি বা বায়ু আক্রান্ত হননি এবং গর্ভবতী অন্যান্য মহিলার মতো কোনো আলামতও তাঁর ছিলনা। হুযুর (সঃ)-এর দেহ যে মাতৃগর্ভে নূর ছিল-ইহাই তার প্রমাণ।

(৬) মিশকাত শরীফে নবী করিম (সঃ) এরশাদ করেছেন-

আমার জন্মের প্রাক্কালে তন্দ্রাবস্থায় আম্মাজান দেখেছিলেন- একটি নূর তাঁর গর্ভ হতে বের হয়ে সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ পর্যন্ত আলোকিত করেছে। আমি আমার মায়ের দেখা সেই নূর।

— মিশকাত শরীফ

(৭) ইমামে আহলে সুন্নাত শাহ আহমদ রেযা খান বেরলভী (রহঃ) হাদায়েকে বখশিশ গ্রন্থের ২য় খণ্ড ৭ পৃষ্ঠায় ছন্দে লিখেন

হে প্রিয় রাসুল! আপনিতো আল্লাহর নূরের প্রতিচ্ছবি বা ছায়া। আপনার প্রতিটি অঙ্গই এক একটি নূরের টুকরা। নূরের যেমন ছায়া হয় না, তদ্রুপ ছায়ারও প্রতিচ্ছায়া হয় না ।

কাজেই আপনারও প্রতিচ্ছায়া নেই-কেননা আপনি নূর এবং আল্লাহর নূরের ছায়া।

(৮) মকতুবাতে ইমামে রাব্বানী ৩য় জিলদ মকতুব নং ১০০তে হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানী (রহঃ) লিখেছেন-

হযরত রাসূল করিম (দঃ)-এর সৃষ্টি কোনো মানুষের সৃষ্টির মতো নয়। বরং নশ্বর জগতের কোনো বস্তুই হযরত নবী করিম (দঃ)-এর সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে স্বীয় নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।

(৯) আশ্রাফ আলী থানবী তার নশরুতত্বীব গ্রন্থের ৫ম পৃষ্ঠায় হাদীস লিখেছেন-

হে জাবের! আল্লাহ তায়ালা আপন নূরের ফয়েয বা জ্যোতি হতে তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন।

— নশরুত ত্বীব ৫ম পৃষ্ঠা

(১০) তাফসীরে সাভী ছুরায়ে মায়েদার ‘ক্বাদ জাআকুম মিনাল্লাহি নূর’ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন-

আল্লাহপাক তাঁকে নূর বলে আখ্যায়িত করার কারণ হচ্ছে- তিনি সকল দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান নূর সমূহের মূল উৎস।

এছাড়াও দেহ মোবারকের প্রতিটি অঙ্গ নূর হওয়ার বহু দলীল কিতাবে উল্লেখ আছে। সুতরাং সৃষ্টির আদিতেও তিনি নূর, মায়ের গর্ভেও নূর এবং দুনিয়াতেও দেহধারী নূর- এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে নূরকে বশরী সুরতে ও কভারে আবৃত করে রাখা হয়েছে মাত্র। যেমন, তারের কভারে বিদ্যুৎকে আবৃত করে রাখা হয়। এতসব প্রমাণ সত্ত্বেও যারা নবী করিম (সঃ)কে মাটির সৃষ্টি বলে- তাদেরকে বেদ্বীন ছাড়া আর কি-ই বলা যাবে?

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

নূরে মোহাম্মদীর (দঃ) স্থানান্তরঃ আদম (আঃ) এর ললাটে

হযরত আদম আলাইহিস সালাম-এর দেহ পৃথিবীর মাটি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। বিবি হাওয়া (আঃ) হযরত আদম (আঃ)-এর বাম পাঁজরের হাঁড় দ্বারা পয়দা হয়েছেন। হযরত ঈসা (আঃ) শুধু রুহের দ্বারা পয়দা হয়েছেন। সাধারণ মানব সন্তান পিতা-মাতার মিলিত বীর্যের নির্যাস দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী ও আল্লাহর প্রিয় হাবীব হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নূর হতে পয়দা হয়েছেন। কোরআন ও হাদীসের দ্বারাই এ সত্য প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং সকল মানুষই মাটির সৃষ্টি-এরূপ দাবি করা গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই নয়। মিনহা খালাক্নাকুম আয়াতের ব্যাখ্যা দেখুন।

পৃথিবীর চল্লিশ হাজার বছরের সমান ঐ জগতের চলি্লশ দিনে হযরত আদম (আঃ)-এর খামিরা শুকানো হয়েছিল। তারপর হযরত আদমের (আঃ) দেহে রুহ্ ফুঁকে দেয়া হয়েছে। বর্ণিত আছে-প্রথমে আদম (আঃ)-এর অন্ধকার দেহে রুহ্ প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর ললাটে হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর নূর মোবারকের অংশবিশেষ স্থাপন করা হয় এবং এতে দেহের ভেতরে আলোর সৃষ্টি হয়। তখনই আদম (আঃ) মানবরূপ ধারণ করেন এবং হাঁচি দিয়ে আল্হামদুলিল্লাহ পাঠ করেন। আমাদের প্রিয় নবী (সঃ)ও সৃষ্টি হয়েই প্রথমে পাঠ করেছিলেন আল্হামদুলিল্লাহ। তাই আল্লাহতায়ালা মানব জাতির প্রথম প্রতিনিধি হযরত আদম (আঃ) এবং বিশ্ব জগতের প্রতিনিধি হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)-এর প্রথম কালাম ‘আল্হামদুলিল্লাহ’ দিয়ে কোরআন মাজিদ শুরু করেছেন (তাফসীরে নঈমী)।

এভাবে ঐ জগতের একহাজার আট কোটি বছর পর মোহাম্মদী নূর হযরত আদম (আঃ)-এর দেহে স্থানান্তরিত হয়। প্রথমে ললাটে, তারপর ডান হাতের শাহাদত অঙ্গুলিতে এবং পরে পৃষ্ঠদেশে সেই নূরে মোহাম্মদীকে (সঃ) স্থাপন করা হয়। এরপর জান্নাতে, তারপর দুনিয়াতে পাঠানো হয় সে নুরকে। ১০৬ মোকাম পাড়ি দিয়ে তিনি অবশেষে মা আমেনার উদর হতে মানব সূরতে ধরাধামে আত্মপ্রকাশ করেন।

হযরত আদম (আঃ)কে বলা হয় প্রথম বশর অর্থাৎ প্রকাশ্য দেহধারী মানুষ। এর পূর্বে কোনো বশর ছিল না। আমাদের প্রিয় নবী (দঃ) তো হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির লক্ষ-কোটি বছর পূর্বেই পয়দা হয়েছিলেন। তখন তিনি বশরী সুরতে ছিলেন না এবং তাঁর নামও বশর ছিল না। তাঁর বশরী সুরত প্রকাশ হয়েছে দুনিয়াতে এসে। এটা উপলব্ধি করা এবং হৃদয়ঙ্গম করা ঈমানদারের কাজ-(জাআল হক-বশর প্রসঙ্গ)। তাই তাঁকে ‘ইয়া বাশারু’ বলে ডাকা হারাম (১৮ পারা)।

হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির পূর্বে নবীজী ছিলেন নূরে মোজাররাদ এবং নবী খেতাবে ভূষিত-(মাওয়াহেব ও মাদারেজ)। মৌলুদে বরজিঞ্জি নামক বিখ্যাত আরবি কিতাবের লেখক ইমাম ও মোজতাহেদ আল্লামা জাফর বরজিঞ্জি মাদানী (বহঃ) লিখেন-

যখন আল্লাহ তায়ালা হাকিকতে মোহাম্মদী প্রকাশ করার ইচ্ছে করলেন-তখন হযরত আদম (আঃ)কে পয়দা করলেন এবং তাঁর ললাটে হযরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর পবিত্র নূর স্থাপন করলেন

আহসানুল মাওয়ায়েয কিতাবে উল্লেখ আছে- একদিন আল্লাহর কাছে হযরত আদম (আঃ)- নূরে মোহাম্মদী (দঃ) দর্শনের জন্য প্রার্থনা করলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আঃ)-এর ডান হাতের শাহাদাত অঙ্গুলীর মাথায় নূরে মোহাম্মদী প্রদর্শন করালেন। মধ্যমা অঙ্গুলীতে হযরত আবু বকর, অনামিকায় হযরত ওমর, কনিষ্ঠায় হযরত ওসমান ও বৃদ্ধাঙ্গুলীতে হযরত আলী (রাঃ)-এই সাহাবী চতুষ্টয়ের দেদীপ্যমান নূরও প্রদর্শন করালেন। অতঃপর সেই নূর স্থাপন করলেন হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে- যাঁর দেদীপ্যমান ঝলক চমকাতো তাঁর ললাটে। আল্লামা ইউসুফ নাবহানীর আনওয়ারে মোহাম্মদী নামক জীবনী গ্রন্থের ১৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে।

যখন আল্লাহ তায়ালা হযরত আদমকে পয়দা করলেন, তখন ঐ নূরে মোহাম্মদী তাঁর পৃষ্ঠে স্থাপন করলেন। সে নূর তাঁর ললাটদেশে চমকাতো।

বেদায়া ও নেহায়া গ্রন্থে উল্লেখ আছে- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) একদিন নবী করীম (দঃ)-এর খেদমতে আরয করলেন-

ইয়া রাসুলাল্লাহ (সঃ), হযরত আদম (আঃ) যখন জান্নাতে ছিলেন, তখন আপনি কোথায় ছিলেন ? হুযুর পুরনূর (দঃ) মুচকি হাসি দিয়ে বললেন- আদমের ঔরসে। তারপর হযরত নূহ (আঃ) তাঁর ঔরসে আমাকে ধারণ করে নৌকায় আরোহন করেছিলেন। তারপর হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশে। তারপর পবিত্র (ঈমানদার) পিতা মাতাগণের মাধ্যমে আমি পৃথিবীতে আগমন করি। আমার পূর্ব পুরুষগণের মধ্যে কেহই চরিত্রহীন ছিলেন না

— বেদায়া-নেহায়া ২য় খণ্ড ২৫ পৃষ্ঠা

সুতরাং হযরত আদম (আঃ) ও তাঁর বংশধরগণ ছিলেন প্রিয় নবীর বাহন মাত্র।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে- নিজের আদি বৃত্তান্ত বর্ণনা করা আল্লাহ প্রদত্ত ইলমে গায়েব ছাড়া সম্ভব নয়। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুযুর (সঃ)-এর আদি জীবন বৃত্তান্ত বর্ণনা করার প্রথা তিনি নিজেই চালু করেছেন। মিলাদ মাহফিলের মূল প্রতিপাদ্যই হলো নবী জীবনী আদি-অন্ত আলোচনা করে দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করা। হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সমস্ত নবীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ছিল নবী করীম (সঃ)-এর জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা। হযরত ইসা (আঃ) তো নবী করিম (দঃ)-এর বেলাদতের ৫৭০ বছর পূর্বেই মিলাদ মাহফিল করেছেন বনী ইসরাঈলের লোকজন লোকজন নিয়ে। কোরআন মজিদের ২৮ পারা সূরা সাফ-এর মধ্যে আল্লাহ তায়ালা হযরত ঈসা (আঃ)-এর এই সম্মিলিত মিলাদ মাহফিলের বর্ণনা দিয়েছেন। বেদায়া ও নেহায়া গ্রন্থের ২য় খণ্ডে ২৬১ পৃষ্ঠায় ইবনে কাছির হযরত আব্বাস (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন

হযরত ঈসা (আঃ) সে সময় কেয়াম অবস্থায় মিলাদ মাহফিল করেছিলেন ।

সুতরাং মিলাদ মাহফিল নতুন অনুষ্ঠান নয়। ফিরিস্তা এবং নবীগণের অনুকরণেই পরবর্তী যুগে বুযুর্গানেদ্বীন কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান মিলাদ মাহফিল প্রচলিত হয়েছে। মিলাদ কিয়াম ভিত্তিহীন নয়। যারা ভিত্তিহীন বলে- তাদের কথারই কোনো ভিত্তি নেই। মিলাদ মাহিফলের বৈধতার উপর তিন শতের উপর কিতাব রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে মওলুদে বরজিঞ্জি গ্রন্থখানী আরব আজমের সর্বত্র অধিক সমাদৃত হয়ে আসছে। পাক-ভারত উপমহাদেশে শেখ আবদুল হক মোহাদ্দেছ দেহলভী (রাঃ)-এর মাদারিজুন্নবুয়ত ও আল্লামা কাজী ফযলে আহমদ (লুধিয়ানা) লিখিত আন্ওয়ারে আফতাবে সাদাকাত গ্রন্থদ্বয় মিলাদ শরীফের বৈধতার প্রামাণিক দলীল।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

নূরে মোহাম্মদী (দঃ) এর পৃথিবীতে আগমন

নবী জীবনী গ্রন্থের নির্ভরযোগ্য কিতাব মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া, বেদায়া-নেহায়া, তারিখুল খোলাফা প্রভৃতি গ্রন্থে নূরে মোহাম্মদী (সঃ)-এর পৃথিবীতে আগমন এবং বংশ পরম্পরায় আবর্তন করার পর অবশেষে হযরত আবদুল্লাহর ঔরসে এবং বিবি আমেনার গর্ভে সে নূর স্থানান্তরিত হয়ে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার প্রত্যুষে সোব্হে সাদেকের সময় জগতকে উদ্ভাসিত করে আত্মপ্রকাশ করা- ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত বিশদ বর্ণনা রয়েছে। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে সংক্ষেপে তা বর্ণনা করার চেষ্টা করবো।

কাজী আয়াযের শিফা নামক গ্রন্থে বর্ণিত একটি হাদীসে নবী করিম (সঃ) বলেছেন-

আমি হযরত আদম (আঃ)-এর সাথেই পৃথিবীতে নেমে এসেছি।

মাওয়াহেব গ্রন্থে উল্লেখ আছে-

হযরত আদম ও বিবি হাওয়া (আঃ)-এর জোড়ায় জোড়ায় সন্তান হতো। প্রতি প্রসবে এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করতো। এভাবে বিশ জোড়া সন্তানের জন্ম হওয়ার কথা। কিন্তু যখন হযরত শিষ (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, তখন তিনি একা জন্মগ্রহণ করেন। কেননা নবী করিম (সঃ)-এর নূর মোবারক হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত শিষ (আঃ)-এর মধ্যে স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে শিষ (আঃ) একা জন্মগ্রহণ করেন।

হযরত আদম (আঃ) নিজ পুত্র শিষ (আঃ)কে অসিয়ত করেছিলেন যে, “তিনি যেনো ঐ নূরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং বংশ পরম্পরায় যেনো পবিত্র নর-নারীগণের মাধ্যমে ঐ নূর স্থানান্তরিত করা হয়”।

হযরত আদম (আঃ) শিষ (আঃ) কে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন- “আমি বেহেস্তের প্রতিটি দরজায় এবং হুর ও ফিরিস্তাদের স্কন্ধদেশে আল্লাহর নামের সাথে মোহাম্মদ (সঃ)-এর নাম মোহরাঙ্কিত দেখেছি। সুতরাং তুমি যখনই আল্লাহর নাম উচ্চারণ করবে, তাঁর সাথে মোহাম্মদ (সঃ)-এর নামও উল্লেখ করবে”।

এ ছিল আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)-এর অসিয়ত নিজ সন্তানের প্রতি। কিন্তু আফসোস! আমরা আদম সন্তান হয়েও পিতার সে উপদেশ ভুলে গেছি। এখন শুধু আল্লাহর নাম নিচ্ছি ও বিভিন্ন জায়গায় লিখছি। কিন্তু মোহাম্মদ (সঃ)-এর নাম বাদ দিয়েছি।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

হযরতের মূল পূর্বপুরুষগণ

হুযুর আকরাম (সঃ)-এর ঊর্ধ্বতন মূলধারার পূর্বপুরুষ নর-নারী সকলেই মোমেন ছিলেন-এ বিষয়ে সংক্ষেপে কয়েকটি প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে।

প্রথম প্রমাণঃ

কোরআন মজিদের একটি আয়াতে আল্লাহ আয়ালা এরশাদ করেনঃ

হে রাসুল! সিজদাকারী মোমেনগণের মধ্যে আপনার আবর্তন আমি লক্ষ্য করেছি।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে-

আপনার পূর্ববর্তী সকল নর-নারী- যাদের মাধ্যমে আপনি আবর্তিত হয়ে এসেছেন- তাঁরা সকলেই ছিলেন সিজদাকারী মোমেন।

— তাফসীরে ইবনে আব্বাস

দ্বিতীয় প্রমাণঃ

নবী করিম (সঃ) এরশাদ করেছেনঃ

আল্লাহ তায়ালা পর্যায়ক্রমে আমাকে পবিত্র ঔরস (মোমেন পুরুষ) হতে পবিত্র গর্ভের (মোমেন নারী) মাধ্যমে পাক-সাফ অবস্থায় স্থানান্তরিত করে পৃথিবীতে এনেছেন।

হাদীসখানা এত পরিষ্কার এবং এত শালীন ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে যে, যুগ যুগান্তরের শিরক ও কুফরীর অপবিত্রতা এবং চরিত্রগত ত্রুটি বিচ্যুতি থেকে হুযুর (দঃ)-এর পূর্ব পুরুষগণের মুক্ত থাকার পরিষ্কার ইঙ্গিত তাতে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। কোরআনের পরিভাষায় পবিত্র নর-নারী বলতে ঈমানদারকেই বুঝানো হয়েছে এবং খবীস বা অপবিত্র বলতে কাফের মোশরেকদেরকেই বুঝানো হয়েছে। (সূরা মোমেনুন ১৮ পারা)

তৃতীয় প্রমাণঃ

ইবনে মোহাম্মদ কলবীর বর্ণনা সূত্রে তাঁর পিতা মোহাম্মদ কলবী (রঃ) বলেনঃ

আমি নবী করিম (দঃ)-এর বংশধারার পূর্ববর্তী পাঁচশত মায়ের তালিকা প্রস্তুত করেছি। তাঁদের মধ্যে আমি চরিত্রহীনতা এবং জাহেলিয়াতের কিছুই পাইনি

— বেদায়া নেহায়া

জাহেলিয়াত অর্থ কুফরী ও শেরেকী। চরিত্রহীনতা অর্থ যিনা। সুতরাং হুযুরের ঊর্দ্ধতন মহিলারা ছিলেন শিরিক, কুফর ও চরিত্রহীনতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত- অর্থাৎ মোমেনা ও সতী-সাধ্বী নারী। সুতরাং উপরোক্ত তিনটি অকাট্য দলীলের দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নবী করিম (সঃ)-এর পিতা মাতা মোমেন ছিলেন এবং মিল্লাতে ইব্রাহীমীর উপর তাঁদের মৃত্যু হয়েছিলো।

ইসলামের আবির্ভাবের পর দশম হিজরীতে যখন নবী করিম (দঃ) হজ্ব করতে মক্কা শরীফে আগমন করেন, তখন হাজুন নামক কবরস্থানে (বর্তমানে জান্নাতুল মায়াল্লা) আল্লাহ পাক তাঁর পিতা-মাতাকে এনে পুনর্জীবিত করে দ্বীনে মোহাম্মদী (সঃ) গ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। ইমাম সোহায়লী ও খতীবে বাগদাদী সূত্রে হযরত আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত এ সম্পর্কীয় হাদীসখানা বেদায়া-নেহায়া গ্রন্থে ইবনে কাসির এবং মাওয়াহেব গ্রন্থে ইমাম কাসতুলানী, ফতোয়ায়ে শামীতে আল্লামা ইবনে আবেদীন বর্ণনা করেছেন।

কিন্তু ওহাবী আলেমগণ বলে থাকেন যে, এসব হাদীস নাকি জাল বা মাওযু। এ কারণেই উপরে তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্র উল্লেখ করা হলো। ওহাবীদের মতে হযরত আবদুল্লাহ ও বিবি আমেনা (রাঃ) নাকি কুফরী হালাতে ইনতিকাল করেছেন, নাউযুবিল্লাহ। তারা যুক্তি হিসেবে বলে থাকে যে, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) রাসূল (সঃ)-এর জন্মের পূর্বে এবং বিবি আমেনা (রাঃ) হুযুরের ছয় বছর বয়সে ইনতিকাল করেছেন। তাই তাঁরা ইসলাম গ্রহণের যুগ পাননি। তাদের এই কুটযুক্তি উপরের তিনটি দলীলের দ্বারা অসার প্রমাণিত হয়েছে। তারা আরো একটি যুক্তি দেখায় যে, বিবি আমেনার (রাঃ) কবর যিয়ারত করতে চাইলে আল্লাহ আয়ালা নবী করিম (সঃ) কে অনুমতি দেন। কিন্তু মাগফিরাতের দোয়ার অনুমতি চাইলে প্রত্যাখ্যান করেন। সুতরাং তাদের মতে তিনি মোমেন ছিলেন না। আল্লামা মানাভী এর জবাব এভাবে দিয়েছেন- কবর যিয়ারতের অনুমতি প্রদানই প্রমাণ করে যে, বিবি আমেনা (রাঃ) মোমেন ছিলেন। আর তিনি নেককার ছিলেন বলেই ঐ সময় মাগফিরাতের প্রার্থনা নামঞ্জুর করা হয়। তবে নবী করিম (সঃ) উম্মতের শিক্ষার জন্য সবসময় মাতা-পিতার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতেন- যার বর্ণনা নিম্নে করা হবে।

বিঃ দ্রঃঃ

এখানে কারো কারো পক্ষ হতেও একটি প্রশ্নের সৃষ্টি হতে পারে। তাহলো- মায়ের মাগফিরাত প্রার্থনা নামঞ্জুর করার কারণ হলো- তিনি ছিলেন নেককার। তাহলে পরবর্তী সময়ে দেখা যায়- নবী করিম (সঃ) সবসময় নিজের জন্য এবং পিতা-মাতার জন্য মাগফিরাত কামনা করতেন। তাহলে কি নবীজী এবং তাঁর পিতা-মাতা বদকার বা গুনাহগার ছিলেন? নাউযুবিল্লাহ !

এ বিষয়টির জবাব তাফসীরে রুহুল বয়ান ২৬ পারা সূরা আল-ফাতাহ ২য় আয়াতের ব্যাখ্যায় এভাবে বলা হয়েছে- হে রাসুল, আপনার উছিলায় আপনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন- আল্লাহর এই বাণীর বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেননা তিনি তো ছিলেন বেগুনাহ। সুতরাং আয়াতে ‘আপনার গুনাহ্’-এর অর্থ হবে ‘আপনার উম্মতের গুনাহ্’।

আর ‘মাগফিরাত’-এর তিনটি অর্থ রয়েছে। যথাঃ

(১) অপরাধ ক্ষমা করা

(২) অপরাধ থেকে হেফাযত করা

(৩) অপরাধের খেয়াল থেকে নিরাপদ রাখা।

প্রথম অর্থ হবে সাধারণ গুনাহগারদের বেলায়। দ্বিতীয় অর্থ হবে নেককার ও আল্লাহর অলী এবং নবীজীর পিতা-মাতা সাহাবীগণের বেলায়। তৃতীয় অর্থ হবে নবীগণের বেলায়।

উক্ত ব্যাখ্যার দ্বারা বুঝা গেলো- নবী করিম (সঃ) নিজের জন্য যে মাগফিরাত কামনা করতেন- তার অর্থ হবে- হে আল্লাহ, আমাকে সদাসর্বদা গুনাহ বা অপরাধের খেয়াল থেকে বাঁচিয়ে রাখিও। হুযুরের পিতা-মাতার জন্য মাগফিরাত কামনার অর্থ হবে- হে আল্লাহ, আমার পিতা-মাতাকে গুনাহ্ থেকে হেফাযতে রাখিও। আর সাধারণ উম্মতের জন্য মাগফিরাত কামনার অর্থ- হে আল্লাহ্ ! তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিও। (রুহুল বয়ান সূরা ফাতহ আয়াত-২)

এখন পরিষ্কার হয়ে গেলো- হুযুরের পিতা-মাতা নেককার ছিলেন এবং নবীজী তাদের গুনাহ হতে হেফাযতের জন্যই দোয়া করতেন এবং গুনাহ ও যাবতীয় অপরাধের খেয়াল থেকে নিজেকে নিষ্পাপ রাখার জন্য তিনি সর্বদা দোয়া করতেন (তাফসীরে রুহুল বয়ান)। একই শব্দের একাধিক অর্থ ও তার প্রয়োগ সম্পর্কে না জানার কারণে অনেকেই নানা মতানৈক্য সৃষ্টি করেন। সর্বোপরি জওয়াব হলো- উম্মতকে শিখানোর জন্যই হুযুর (দঃ) ঐভাবে দোয়া করতেন।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

নবী করিম (দঃ) এর পিতা-মাতার নতুন করে ইসলাম গ্রহণ

নবী করিম (সঃ)-এর পিতা-মাতা হুযুরের নবুয়তের যুগ পাননি। কিন্তু তাঁরা ছিলেন মিল্লাতে ইব্রাহীমীর উপর প্রতিষ্ঠিত একেশ্বরবাদী হানিফ সম্প্রদায়ভুক্ত মোমেন। তাঁদের মতো আরবে আরও কিছু লোক হানিফ সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। যেমন-আবদুল মোত্তালেব, ওয়ারাকা ইবনে নওফেল, হযরত খাদিজা ও হযরত আবু বকর প্রমুখ। যাঁরা নবুয়ত যুগের পূর্বে ইনতিকাল করেছেন, তাঁদেরকে আসহাবে ফাৎরাত বলা হয়। তাঁরা ছিলেন তৌহিদবাদী হানিফ। নবী করিম (সঃ)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ এবং মাতা বিবি আমেনাও ছিলেন অনুরূপ তৌহিদপন্থী মোমেন।

যখন নবী করিম (দঃ)-জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ১০ম হিজরীতে এক লাখ চব্বিশ হাজার সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে মক্কা শরীফে হজ্ব করতে আসেন, তখন একদিন বিবি আয়েশা (রাঃ) কে সাথে নিয়ে জান্নাতুল মায়াল্লাতে বিবি খাদিজা (রাঃ)-এর মাযার যিয়ারত করতে গেলেন (তখন নাম ছিল হাজুন)। হযরত আয়েশা (রাঃ)-গাধার লাগাম ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। নবী করিম (সঃ) যিয়ারতকালে প্রথমে খুব কাঁদলেন-পরে হাসলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) কারণ জানতে চাইলে হুযুর আকরাম (দঃ) বললেন-

আমার পিতা-মাতাকে আল্লাহ্ পাক পুনঃজীবিত করে আমার সামনে হাযির করেছেন। তাঁরা নতুন করে ইসলাম গ্রহণ করে পুনরায় মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি পিতা-মাতাকে দেখে খুশী হয়ে হেসেছি

— বেদায়া ও নেহায়া

ইমাম সোহায়লীর বরাত দিয়ে ইবনে কাছির এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ফতোয়া শামীতে হাফেয নাসিরুদ্দীন বাগ্দাদীর বরাতে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে একখানা হাদীস উদ্ধৃত করে আল্লামা শামী লিখেছেন-

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন-

আল্লাহ্তায়ালা নবী করিম (সঃ)-এর সম্মানে তাঁর পিতা-মাতাকে পুনর্জীবিত করেন। তাঁরা উত্তয়ে নূতন করে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপরে তাঁরা পুনরায় পূর্বের ন্যায় মৃত্যুবরণ করেন। যেমন আল্লাহ্পাক হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে মৃতকে জীবিত করতেন-তদ্রুপ নবীজীর খাতিরেও করেছেন

— শামী

সুতরাং আমরা এখন থেকে মুক্তকণ্ঠে বলবো-হযরত আবদুল্লাহ ও হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহু আন্হুমা। কেননা, তাঁরা সাহাবী হিসেবে গণ্য।

বিঃ দ্রঃ

হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাইল (আঃ) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন-যেনো তাঁদের বংশধরদের (আরব) মধ্যে প্রত্যেক যুগেই কিছু না কিছু মুসলিম বিদ্যমান থাকে (সুরা বাকারাহ, ১২৮ আয়াত)।

রাব্বানা ওয়াজ আলনা মুসলিমাইনে লাকা ওয়া মিন জুররিয়্যাতিনা উম্মাতাম মুসলিমাতাল লাকা।

হে আমার রব! আমাদের উভয়কে তুমি তোমার অনুগত মুসলিম হিসেবে কবুল করো এবং আমাদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যেও (আরব দেশে) কিছু সংখ্যক লোককে অনুগত মুসলিম বানিয়ে রেখো।

এই দোয়ার বরকতেই পরবর্তী প্রত্যেক যুগেই আরবে কিছু সংখ্যক সত্যপন্থী হানিফ সম্প্রদায় বিদ্যমান ছিলেন। নবী করিম (সঃ)-এর পিতা-মাতা ও মূল পূর্বপুরুষগণ এই হানিফ সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। তাঁদেরকে কাফের মনে করা বেদ্বীনী কাজ। ইতিহাসেও হানিফ সম্প্রদায়ের উল্লেখ রয়েছে। বাতিলপন্থীরা ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে বে-খবর।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

বিবি আমেনার গর্ভে নূরে মোহাম্মদীর সরাসরি গমন

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির চৌদ্দ হাজার বছর পূর্বে (পৃথিবীর হিসেবে পাঁচশত এগার কোটি বছর পূর্বে) নবী করিম (সঃ) নূর হিসেবে আল্লাহর সান্নিধ্যে বিদ্যমান ছিলেন। এরপর হযরত আদম (আঃ)-এর সাথে সেই নূর পৃথিবীতে আগমন করেন এবং হযরত শিষ, হযরত ইদ্রিস, হযরত নূহ, হযরত ইব্রাহীম ও হযরত ইসমাইল (আঃ) প্রমুখ পয়গাম্বর ও নেককারগণের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হতে হতে অবশেষে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর ললাটে স্থানলাভ করেন। হযরত ইসমাইল ও হযরত আবদুল্লাহ ছিলেন যবিহউল্লাহ। নবী করিম (দঃ) স্বয়ং শুকরিয়া আদায় করে বলতেন-

আমি দুই যবিহউল্লাহর সন্তান।

হযরত আবদুল্লাহর (রাঃ) বয়স যখন চব্বিশ বছর, তখন পিতা তাঁকে বিবাহ করানোর উদ্দেশ্যে পাত্রীর অনুসন্ধানে বের হন। পথিমধ্যে ওয়ারাকা ইবনে নওফেল-এর বোন ফাতেমা-ওরফে উম্মে কিতাল হযরত আবদুল্লাহর ললাটে নূর লক্ষ্য করে স্বেচ্ছায় বিবাহের প্রস্তাব দেন। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ পিতার সম্মানে ঐ প্রস্তাব নাকচ করে দেন।

ঐ দিনই মদিনাবাসী এবং মক্কায় প্রবাসী ওহাব ইবনে আবদে মুনাফ-এর ভাগ্যবতী কন্যা বিবি আমেনার সাথে হযরত আবদুল্লাহর বিবাহ সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য যে, মদিনার বনী আদি বংশের জাহরা গোত্রে আবদুল মোত্তালেবও বিবাহ করেছিলেন এবং সেই ঘরে আবু তালেব, হযরত হামজা, হযরত আব্বাছ ও নবী করিম (সঃ)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন। সেই গোত্রেরই কন্যা ছিলেন বিবি আমেনা (রাঃ)। সুতরাং হযরত আবদুল্লাহ ও নবী করিম (সঃ)-উভয়েরই মাতুলালয় ছিল মদিনা।

রজব মাসের প্রারম্ভে এই শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয় এবং ঐ দিনেই মিনার নিকটে শিয়াবে আবি তালেব নামক স্থানে স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষাৎ হয়। ঐ দিনেই হযরত আবদুল্লাহর (রাঃ)-এর ললাট হতে নবুয়তের পবিত্র নূর মা আমেনার (রাঃ) গর্ভে সরাসরি স্থানান্তরিত হয় (মাওয়াহেব ও বেদায়া নেহায়া)। পহেলা রজব শুক্রবার রাতে নবী করিম (দঃ)-এর পবিত্র নূর (মাটি নয়) মায়ের রেহেমে স্থানলাভ করেন বলে মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া ও আনওয়ারে মোহাম্মদীয়া গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। ইবনে ইসহাক কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বিবি আমেনার (রাঃ) সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঐ রাত্রেই বিবি আমেনাকে স্বপ্নযোগে জানিয়ে দেয়া হয়-

তুমি এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানবকে ধারণ করেছ। সন্তান ভূমিষ্ট হলে তাঁর নাম রাখবে মোহাম্মদ (দঃ) বা বারংবার প্রশংসিত।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) রেওয়ায়াত করেন যে, | ঐ রাত্রেই কোরেশদের গৃহপালিত পশুগুলো নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল যে, আজ সমগ্র পৃথিবীর চেরাগ, আল্লাহর প্রিয় রাসুল (সঃ) মাতৃগর্ভে এসেছেন। আল্লাহর কুদরতে সমগ্র পৃথিবীর প্রাণীকুলের মধ্যে একটি নৈসর্গিক আনন্দের ঢেউ খেলে গিয়েছিল। কিন্তু খুশী হতে পারেনি সেদিন অভিশপ্ত শয়তান |( আনওয়ারে মোহাম্মদিয়া )

আজও মানবরূপী কিছু শয়তান মিলাদুন্নবীর শুভদিনে খুশী হতে পারেনা। তারা এই আনন্দময় দিবসে মিলাদুন্নবীর বিরুদ্ধে নানা কথা বলে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলির সমালোচনা করে এবং মিলাদুন্নবী (সঃ) মাহফিল ও অনুষ্ঠানকে বেদাত বলে অপপ্রচার চালাতে থাকে। অথচ মিলাদুন্নবীর প্রথা সুন্নাতসম্মত একটি প্রথা।

বিবি আমেনা (রাঃ)-এর সাথে পরিণয়ের পরদিন হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনকালে পথে ফাতেমা-ওরফে উম্মে কিতালের সাথে সাক্ষাৎ হয়। এবার মহিলা হযরত আবদুল্লাহকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেন। কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জবাবে বলেন-

গতকাল তোমার ললাটে যে নূর ছিল- আজ সে নূর তোমার থেকে বিদায় নিয়েছে। সুতরাং আজ তোমাতে আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই। আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল- সেই নূর আমার মধ্যে স্থানান্তরিত হোক। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল না- তাই তিনি অন্যত্র স্থানান্তরিত করেছেন।

— মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া

একজন সাধারণ মহিলা হয়েও উম্মে কিতাল নবী করিম (সঃ)কে নূর হিসেবে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হলো। কিন্তু হতভাগা ওহাবীরা তাঁকে প্রত্যক্ষ করলো মাটির মানুষ হিসেবে। জনৈক পীর তার অসিয়ত ও নছিহতনামায় নবী করিম (সঃ) কে সাধারণ মানুষ প্রমাণ করার জন্য লিখেছে- “নবী পাক (সঃ) পিতার নাপাকী থেকে মায়ের নাপাকীর সাথে মিশে আবার নাপাক জায়গার ভেতর দিয়েই পৃথিবীতে এসেছেন”। নাউযুবিল্লাহ !

এমন অশালীন ও অসভ্য উক্তি একজন কাফেরও কোনদিন করেনি। আল্লাহ এসব দুশমনে রাসুল-এর সংশ্রব থেকে মুসলমানকে রক্ষা করুন।

হযরত বিবি আমেনা (রাঃ) নূরনবীকে গর্ভে ধারণ করার দুই মাস পরেই হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া গমন করে সেখান হতে ফেরার পথে মদিনায় মাতুলালয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই ইনতিকাল করেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন! তাঁকে ‘দারুন নাবেগা’ নামক মহল্লায় (বর্তমান মসজিদে নববীর ভেতরে) দাফন করা হয় (বেদায়া)। এভাবে শিশুনবী (সঃ) জন্মের পূর্বেই ইয়াতিমে পরিণত হন। গর্ভের প্রায় নয় মাস অতিক্রান্ত হবার পর রবিউল আউয়াল মাসের দ্বাদশ তারিখ সোমবার সোবহে সাদেকের সময় দিবা-রাত্রির সন্ধিক্ষণে জগতকে আলোকিত করে ধরাধামে আগমন করেন আল্লাহর প্রিয় হাবীব শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম।

বেলাদতের তারিখ ও দিনের সমাধান

আজকাল এক শ্রেণীর লোক বলে বেড়ায়-নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নাকি মতভেদ রয়েছে। সুতরাং ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখটিই যে ঠিক-তা কি করে বলা যাবে?

এর জবাবে আমরা বলবো-যদি সহিহ বর্ণনায় এই তারিখটি সুপ্রমাণিত হয়, তাহলে কি তারা এই দিনটি মিলাদুন্নবী দিবস হিসেবে পালন করতে রাজী আছেন? না, কখনও আশা করা যায় না। আপনারা দিবস পালন করুন- আর নাই করুন, নবী করিম (সঃ) যে এই তারিখেই জন্মগ্রহণ করেছেন- তার অকাট্য প্রমাণ নিন।

আপনাদের গুরু ইবনে কাছির তার বেদায়া ও নেহায়া গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ২৬০ পৃষ্ঠায় (পুরাতন) এবং হাফেয আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (ওফাত ২৫৩ হিঃ) সহীহ সনদে হযরত জাবের ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাদিঃ) থেকে আফফান ও সায়ীদ ইবনে মীনা-এর সহীহ সনদ সূত্রে হুযুর আকরাম (সঃ)-এর জন্ম তারিখ ও ইনতিকাল তারিখ সম্পর্কে নিম্নে উল্লেখিত হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন-

হযরত আফফান থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত সায়ীদ ইবনে মীনা থেকে, তিনি হযরত জাবের (রাঃ) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। জাবের ও ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন-

নবী করিম (দঃ) হস্তীবাহিনী বর্ষে সোমবার দিনে ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন, এই দিনেই তিনি নবুয়তের দায়িত্ব পেয়েছেন, এই দিনেই তিনি হিজরত করেছেন এবং এই দিনেই ওফাত পেয়েছেন।

ইবনে কাছির বলেন-

ইহাই প্রসিদ্ধ ও মশহুর মত

— বেদায়া ও নেহায়া ২য় খণ্ড ২৬০ পৃষ্ঠা

সুতরাং তাদের নেতার কথা মান্য করা তাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।

হুযুর (দঃ) ভূমিষ্ঠ

আল্লাহর প্রিয় হাবীব (সঃ) পিতা-মাতার মাধ্যমে নূর হিসাবেই দুনিয়াতে আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর আগমনের ধরন ছিল ভিন্ন রকম। সাধারণ মায়েরা গর্ভকালীন ব্যথা অনুভব করে থাকেন এবং প্রসবকালীন সময়ে প্রচণ্ড কষ্ট ও ব্যথা পেয়ে থাকেন। কিন্তু বিবি আমেনা (রাঃ) গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সময়ে কোনো ওজন অথবা ব্যথা-বেদনা কিছুই অনুভব করেননি। অন্যান্য মায়ের প্রসবকালীন সময়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু নবীজীর মায়ের এ অবস্থা ছিলনা, বরং বের হয়েছিল একটি নূর-যা মক্কাভূমি থেকে সিরিয়া পর্যন্ত আলোকিত করেছিল। সে নূর ছিল নবী করিম (সঃ)-এ নূর মোবারক।

অন্যান্য সন্তান মায়ের নাভির মাধ্যমে গর্ভে খাদ্য গ্রহণ করে এবং ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নাভি কাটা হয়। কিন্তু নবী করিম (সঃ) মায়ের নাভির সাথে যুক্ত ছিলেন না, বরং নাভি কর্তিত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। অন্যান্য সন্তান রক্তমাখা অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়, কিন্তু নবী করিম (সঃ) পবিত্র অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। অন্যান্য সন্তান উলঙ্গ ও খতনাবিহীন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু নবী করিম (সঃ) বেহেস্তি লেবাছ পরিহিত, সুরমা মাখা চোখ ও খতনাকৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন।

নবী করিম (সঃ) এরশাদ করেছেন,

জন্মকালে কেউ আমার ছতর দেখেনি।

— বেদায়া নেহায়া ২য় খন্ড ২৬১ পৃষ্ঠা

মাদারিজুন্নবুয়ত কিতাবে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। অন্যান্য সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে ওয়া (হুয়া) করে চিৎকার দেয়। কিন্তু নবী করিম (সঃ) ভূমিষ্ঠ হয়েই প্রথমে সিজদা করেন এবং পরে শুদ্ধ আরবি ভাষায় আশহাদু আল-লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্নী রাসুলুল্লাহ কালেমা শরীফ পাঠ করেছিলেন ।(আল্লামা দিয়ার বিকরীর তারিখুল খামিছ ও সুয়ুতির খাছায়েছে কুবরা) । সুতরাং নবী করিম (সঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রকৃতি ভিন্ন ধরনের হওয়াই স্বাভাবিক। আল্লাহ যাকে যেভাবে ইচ্ছা-সৃষ্টি করতে পারেন।

আল্লাহ তায়ালা আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়া (আঃ) কে পিতামাতা ছাড়াই সরাসরি পয়দা করেছেন। একজনকে মাটি দিয়ে, অন্যজনকে বাম পাঁজরের হাড় দিয়ে। হযরত ঈসা (আঃ) কে পিতার বীর্য ছাড়া শুধু রুহ দিয়ে বিবি মরিয়মের গর্ভে পয়দা করেছেন। সাধারণ মানুষ পয়দা হয় পিতা মাতার নুৎফা বা বীর্য থেকে, সরাসরি মাটি দিয়ে নয়। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী (সঃ) কে আল্লাহ পয়দা করেছেন নূরের দ্বারা। এই নূর কোন্ পদ্ধতিতে পিতার পৃষ্ঠ থেকে মায়ের গর্ভে গেলেন এবং কোন্ পদ্ধতিতে মায়ের গর্ভ হতে দুনিয়াতে পদার্পন করলেন-তা গবেষণার বিষয় নয়-বরং কুদরতের উপর বিশ্বাস স্থাপনই এর একমাত্র সমাধান।

মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরীর ফতোয়াঃ

এবার আসুন, এ ব্যাপারে ওলামাগণের মতামত কী-তা আলোচনা করি। হাদীয়ে বাঙ্গাল ও আসাম নামে পরিচিত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী সাহেবের সাহেবজাদা মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরী সাহেব আরবিতে একখানা কিতাব রচনা করেছেন। উক্ত কিতাবের নাম- “নবী করিম (সঃ)-এর বেলাদত শরীফের ধরন সম্পর্কে উত্তম রেওয়ায়াত ও দলীল”।

উক্ত কিতাবে তিনি কয়েকখানা বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাবের এবারত উদ্ধৃত করে অবশেষে নিজের মতামত বা ফতোয়া প্রদান করেছেন। আমরা উক্ত কিতাবের ফতোয়ার এবারত হুবহু পাঠকের সামনে উপস্থাপন করছি। উক্ত কিতাবের ফটোকপি অধম লেখকের নিকট সংরক্ষিত আছে।

আল্লামা আবদুল্লাহ শাব্রাভী (রাঃ) স্বীয় আল আতহাফ বিহুব্বিল আশরাফ গ্রন্থে নবী করিম (সঃ)-এর পবিত্র দেহ থেকে বহির্গত যাবতীয় বর্জ্য বস্তুর পবিত্রতা শীর্ষক আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লামা তিলিমসানী কর্তৃক একটি ফতোয়ার উল্লেখ করে বলেন, উক্ত আল্লামা তিলিমসানী ফতোয়া দিয়েছেন যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) ব্যতিত প্রত্যেক মানব সন্তান মায়ের প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকে। অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) ভূমিষ্ঠ হয়েছেন মায়ের নাভি ও প্রস্রাবের রাস্তায় মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে এবং আমাদের প্রিয়নবী (দঃ) ভূমিষ্ঠ হয়েছেন বিবি আমেনার (রাঃ)-এর বাম উরুদেশ দিয়ে-যা বাম পাঁজরের হাড়ের নিচে অবস্থিত। তারপর উক্ত স্থান সাথে সাথেই জোড়া লেগে যায়। এই বিশেষ ব্যবস্থাধীনে ভূমিষ্ঠ হওয়া নবী করিম (সঃ)-এর একক বৈশিষ্ট্য। কোনো নবী (আঃ) মায়ের প্রস্রাবের স্থান দিয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়ার বর্ণনাটি সঠিক নয়। একারণেই মালেকী মাযহাবের মুফতী ও উলামাগণ ফতোয়া দিয়েছেন যে,

যে ব্যক্তি বলবে-নবী করিম (সঃ) মায়ের প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন, তাকে কতল করা ওয়াজিব

— উদম্দাতুন নুকুল ফী কাইফিয়াতে বিলাদাতির রাসূল-মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরী এবং মূল গ্রন্থ আল আতহাফ-বি-হুব্বিল আশরাফ-আল্লামা শাবরাভী

উক্ত ফতোয়া উল্লেখ করে মাওলানা আবদুল আউয়াল জৌনপুরী সাহেব নিজের মন্তব্য ও ফতোয়া এভাবে পেশ করেছেন-

আল্লাহর নিকট তৌফিক চেয়ে আমি (আবদুল আউয়াল জৌনপুরী) বলছি- নবী করিম (সঃ) ছিলেন আপাদমস্তক দেহধারী নূর।

যেমন কোরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে একজন সম্মানীত নূর ও একটি স্পষ্ট কিতাব এসেছে”।

পবিত্র হাদীসেও রাসুল (সঃ)কে নূর বলে প্রমাণ করা হয়েছে। যেমন- হযরত যাকওয়ান (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে- “চন্দ্র সূর্যের আলোতে নবী করিম (সঃ)-এর ছায়া পড়তনা” (কেননা নূরের ছায়া হয় না)। উক্ত হাদীস হাকিম তিরমিজী নিজ কিতাবে সংকলন করেছেন।

হযরত ইবনে ছাব বর্ণনা করেন- “নবী করিম (সঃ) ছিলেন আপাদমস্তক নূর। কেননা যখন তিনি দিবাকরের আলোতে কিংবা চন্দ্রিমা নিশিতে চলাফেরা করতেন, তখন তাঁর ছায়া দেখা যেতনা”।

নূরের প্রমাণবহ আর একখানা হাদীস অন্য সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। নবী করিম (সঃ) উক্ত হাদীসে এরশাদ করেছেন, “হে আল্লাহ! আমাকে নূর হিসেবে গণ্য কর” (মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া)। নবী করিম (সঃ) যে মায়ের গর্ভেও নূর হিসেবেই বিরাজমান ছিলেন- এ মর্মে আবু যাকারিয়া ইবনে ইয়াহইয়া কর্তৃক বর্ণিত হাদীসও ইহার সত্যতা প্রমাণ করে। সুতরাং নবী করিম (সঃ) অন্যান্য মানব সন্তানের জন্মের চিরাচরিত নিয়মের ব্যতিক্রমধর্মী স্থান দিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেছেন- এটা কোনো অসম্ভব ব্যাপারই নয় । আল্লাহ যখন কিছু সৃষ্টির ইচ্ছা করেন, তখন পূর্ববর্তী চিরাচরিত যে কোনো নিয়ম ও রীতি ভঙ্গ করে নূতন পন্থায় সম্পূর্ণ নূতন নিয়মে সৃষ্টি করতে পারেন। তোমরা কি জাননা- কীভাবে আদম হাওয়াকে চিরাচরিত নিয়মের ব্যতিক্রমধর্মী নিয়মে পয়দা করেছেন? হযরত ঈসা (আঃ)কেও চিরাচরিত নিয়মের বিপরীত ব্যবস্থায় শুধু মায়ের গর্ভে বীর্য ছাড়া পয়দা করেছেন । সুতরাং নবী করিম (সঃ)কে ভিন্ন নিয়মে ভূমিষ্ঠ করানো অসম্ভব হবে কেন?

— আবদুল আউয়াল জৌনপুরী।

তিনি তো হায়াতুন্নবী! তিনি উম্মতের ভালমন্দ কর্ম ও চিন্তা-ধারণা সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। হাদীসে পাকে এসেছে-

তোমাদের ভালমন্দ সব আমলই আমার নজরে আনা হয়।

সুতরাং নবী করিম (সঃ)-এর ব্যতিক্রমধর্মী বেলাদাত শরীফ সম্পর্কে কোনো ঈমানদারের মনে আর সন্দেহ থাকতে পারে না। কিতাবে প্রমাণ পাওয়া গেলে মানতে অসুবিধা কোথায়? আসলে এক ধরনের জ্ঞান পাপীরা সব সময়ই নবী করিম (সঃ) কে সাধারণ মানুষের সাথে তুলনা করতে আনন্দ বোধ করে, যেমন আনন্দবোধ করতো মক্কার কাফেরগণ। তারা বলতো “মুহাম্মদ (দঃ) তো আমাদের মতই একজন মানুষ”। এ ধরনের উক্তি কাফেররাই করে, কোনো মোমেন করতে পারে না। নবীজী বিনয়মূলক বলতে পারেন- “আমি তোমাদের ন্যায় মানুষ”- কিন্তু উম্মত একথা বলতে পারবে না, “তিনি আমাদের মতো মানুষ”।

সার কথা হলো- সাধারণ সন্তানগনের ভূমিষ্ঠ হওয়ার ধরন এক রকমের। অন্যান্য নবীগণের (আঃ) ভূমিষ্ঠ হওয়ার ধরন আরেক রকমের এবং আমাদের নবী করিম (সঃ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার ধরন অন্য নবীগণ থেকেও ভিন্ন।

সাধারণ ডাক্তারগণ বর্তমানকালে নরমাল ও সিজারিয়ান- এই দুই পদ্ধতিতেই সন্তান ভূমিষ্ঠ করাতে সক্ষম। সৃষ্টিকর্তার কুদরত কি এতই অক্ষম হয়ে গেলো? (নাউযুবিল্লাহ!) নবীগণের জন্ম-মৃত্যু ও জীবন পদ্ধতি সাধারণ মানুষের চেয়ে উন্নত ধরনের হওয়াই যুক্তিযুক্ত। সব কিছুই যদি সাধারণ মানুষের ন্যায় হতো- তাহলে তাঁদেরকে মহামানব বলা হতো না। আল্লামা শরফুদ্দীন বছিরী-যিনি নবীজীর শানে কাছিদায়ে বুরদা লিখে দূরারোগ্য প্যারালাইসিস থেকে আশ্চর্যজনকভাবে মুক্তিলাভ করেছিলেন- তিনি তাঁর কাসিদায় বলেছেন-

মোহাম্মদ (সঃ) মানব জাতি হয়েও কোনো মানুষের মতই নন।

যেমন ‘ইয়াকুত’ পাথর জাতীয় হয়েও কোনো পাথরের মতই নয়

— কাসিদা বুরদা শরীফ

নবীজীর হাকীকত পরিচয় দিয়ে জনৈক উর্দু কবি বলেছেনঃ

হে প্রিয় রাসুল! আপনি তো খোদা নন যে- খোদা বলবো। আপনিই বলে দিন- আপনাকে কি নামে আখ্যায়িত করবো? কেননা, ঊর্ধ্বজগতেও আপনার মতো কেউ নেই এবং জমিনেও আপনার মতো কেউ নেই।

অর্থাৎ আপনার উদাহরণ আপনিই। নূরের ফেরেস্তা যে সীমায় গেলে জ্বরে পুড়ে যায়- সেখানে আপনি নিরাপদে বিচরণ করেছেন। বুঝা গেল- তিনি মাটির দেহধারী ছিলেন না- বরং নূরানী মহামানব।

ঈদে মিলাদুন্নবী ও জন্মবার্ষিকী পালন

১। হযরত আব্বাছ (রাঃ) নূর নবী (সঃ)-এর জন্ম প্রসঙ্গে ৯ম হিজরীতে একটি কবিতায় বলেছেন-

হে প্রিয় রাসুল, আপনি যখন ভূমিষ্ঠ হন, তখন পৃথিবী উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল এবং আপনার নূরের ছটায় চতুর্দিক আলোকময় হয়ে গিয়েছিল

— নশরুত ত্বীব, মাওয়াহিব, বেদায়া ও নেহায়া

২। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত হাস্সান বিন সাবিত (রাঃ) মিলাদুন্নবী (দঃ) বর্ণনা প্রসঙ্গে একখানি কবিতাগ্রন্থ লিখেছিলেন এবং হুযুর (দঃ)কে শুনিয়েছিলেন- পরবর্তীতে যার নামকরণ করা হয়েছিল ‘দিওয়ানে হাস্সান বিন সাবিত’। তিনি লিখেন-

হে প্রিয় রাসুল! আপনি সর্বপ্রকার ত্রুটিমুক্ত হয়েই মাসুম নবী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন। মনে হয়- যেনো আপনার ইচ্ছা অনুযায়ীই আপনার বর্তমান সূরত পয়দা করা হয়েছে”। “মহান আল্লাহ আযানের মধ্যে আপন নামের সাথে নবীর নাম সংযোজন করেছেন- যখন মোয়াজ্জিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আযানে ঊচ্চারণ করেন “আশহাদু আল লাইলাহা ইল্লাল্লাহু; আশহাদু আন্না মোহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ (সঃ)”। আর আল্লাহ আপন নামের অংশ দিয়ে তাঁর প্রিয় হাবীবের নাম রেখেছেন। আরশের অধিপতি হলেন ‘মাহমুদ’ এবং ইনি হলেন ‘মোহাম্মদ (সঃ)’ ।

মাহমুদ থেকে মোহাম্মদ নামের সৃষ্টি হয়েছে এবং আহাদ থেকে আহমদ নামের সৃষ্টি হয়েছে (আল হাদীস)। মাহমুদ থেকে মোহাম্মদ গঠনে একটি ওয়াও অক্ষর বাদ দিতে হয় এবং আহাদ থেকে আহমদ গঠনে একটি মিম (م) অক্ষর যোগ করতে হয়। যোগ বিয়োগের এই প্রক্রিয়াটি সুফী সাধকগণের নিকট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ মাহমুদ ও মোহাম্মদ এবং আহাদ ও আহমদ অতি ঘনিষ্ঠ। আল্লাহ নামটি চার অক্ষর বিশিষ্ট এবং মোহাম্মদ ও আহমদ নামটিও চার অক্ষর বিশিষ্ট। প্রধান ফিরিস্তা, প্রধান আসমানী কিতাব, প্রধান সাহাবী, প্রধান মযহাব ও প্রধান তরিকার সংখ্যা চার চার এবং এবং সৃষ্টির প্রধান উপাদানও চারটি- যথা- আব, আতিশ, খাক, বাদ (আগুন, পানি, মাটি, বায়ু)। কালেমা তাইয়্যেবায় তাওহীদের অংশ বার অক্ষর বিশিষ্ট এবং রিসালাতের অংশও বার অক্ষর বিশিষ্ট। নবী করিম (সঃ)-এর নামকরণ এবং কলেমাতে আল্লাহর সাথে মোহাম্মদ নাম সংযোজন- সবই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। এতে মানুষের কোনো হাত নেই। সুতরাং এ পরিকল্পনার তাৎপর্য পূর্ণভাবে উপলব্ধি করাও মানুষের সাধ্যাতীত ব্যাপার।

এখানে উপরোল্লিখিত হযরত আব্বাস ও হযরত হাস্সান সাহাবীদ্বয়ের (রাঃ) কাব্য রচনার ঘটনাটি ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন ও স্মরণিকা প্রকাশের একটি উত্তম দলীল ও প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা কোরআন মজিদে সূরা ইউনুছ ৫৮ আয়াতে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে প্রতি বছর ঈদ ও পবিত্র আনন্দানুষ্ঠান পালনের কথা উল্লেখ করেছেন। সূরা বাকারাতে মুছা (আঃ) ও বনী ইসরাইলগণের নীলনদ পার হওয়া এবং প্রতি বছর এ উপলক্ষে আশুরার রোযা ও ঈদ পালন করা এবং সূরা মায়েদায় ঈছা (আঃ) ও বনী ইস্রাইলের হাওয়ারীগণের জন্য আকাশ থেকে আল্লাহ কর্তৃক যিয়াফত হিসেবে মায়েদা অবতীর্ণ হওয়া উপলক্ষে প্রতি বছর ঐ দিনকে ঈদের দিন হিসেবে পালন করার কথা কোরআনে উল্লেখ আছে।

বনী ইস্রাইলদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিলের স্মরণে যদি প্রতি বছর ঐ দিনে ঈদ পালন করা হয়, তাহলে আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত- রাহমাতুল্লীল আলামীন (সঃ)-এর আগমন দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) পালন করা যাবে না কেন? হুযুর করিম (সঃ) কে এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ (সঃ)! প্রতি সোমবার আপনার রোযা রাখার কারণ কি? হুযুর (সঃ) বললেন-

এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই (সোমবার) ২৭ শে রমযান আমার উপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে ।

উক্ত প্রমাণাদিই ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) পালনের সপক্ষে জোরালো দলীল।

উল্লেখ্য, ঈদ মোট ৯টি যথাঃ

(১) ঈদে রামাদ্বান

(২) ঈদে কোরবান

(৩) ঈদে আরাফা

(৪) ঈদে জুমুয়া

(৫) ঈদে শবে বারাআত

(৬) ঈদে শবে ক্বদর

(৭) ঈদে আশুরা

(৮) ঈদে নুযুলে মায়েদা

(৯) ঈদে মিলাদুন্নবী।

সবগুলোই কোরআনে, হাদীসে ও বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

ইন্তেকাল দিবস পালন করা হয় না কেন ?

আর একটি বিষয় প্রশ্ন সাপেক্ষ! তা হচ্ছে- নবী করিম (সঃ)-এর শুধু জন্ম তারিখ পালন করা হয় কেন? ইনতিকাল তো একই তারিখে এবং একই দিনে হয়েছিল। সুতরাং একসাথে জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন করাইতো যুক্তিযুক্ত। যেমন অন্যান্য মহামানব অলী-গাউসদের বেলায় মৃত্যু দিবসে ওরস পালন করা হয়ে থাকে।

প্রথম উত্তর হলোঃ

আল্লাহ পাক কোরআন মজিদে নির্দেশ করেছেন নিয়ামত পেয়ে খুশি ও আনন্দ করার জন্য। নিয়ামত পাওয়া জন্ম উপলক্ষেই হয়। যেমন কোরআনে আছেঃ

হে নবী! আপনি একথা ঘোষণা করে দিন-মুসলমানগণ খোদার ফযল ও রহমত পাওয়ার কারণে যেনো নির্মল খুশি ও আনন্দ উৎসব করে। ইহা তাদের যাবতীয় সঞ্চিত সম্পদ থেকে উত্তম।

তাফসীরে রুহুল মাআনী উক্ত আয়াতে ‘ফযল ও রহমত’ অর্থে মোহাম্মদ (সঃ)-এর নাম উল্লেখ করেছেন- ইহা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর ব্যাখ্যা। রাসুল (সঃ)-এর এক হাজার চারশত নামের মধ্যে ফযল, রহমত, বরকত, নেয়ামত, নূর-প্রভৃতি অন্যতম গুণবাচক নাম- যা গ্রন্থের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং নেয়ামত প্রাপ্তি উপলক্ষে শুকরিয়া আদায়ের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠান করাই কোরআনের নির্দেশ। সূরা ইউনুসের উক্ত ৫৮নং আয়াতে নবীজীর জন্মোৎসব পালন করার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবী ও জশনে জুলুছ কোরআনের আলোকে প্রমাণিত। (তাফসীরে রূহুল মাআনী সূরা ইউনুছ ৫৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা)

মোদ্দাকথাঃ

আল্লাহপাক হুযুর (সঃ)-এর আবির্ভাব উপলক্ষে আনন্দোৎসব করার নির্দেশ করেছেন। কিন্তু ইনতিকাল উপলক্ষে শোক পালন করতে বলেন নি। তাই আমরা আল্লাহর নির্দেশ মানি। ওরা কার নির্দেশ মানে?

দ্বিতীয় উত্তরঃ

নবী করিম (সঃ) নিজে সোমবারের রোযা রাখার কারণ হিসেবে তাঁর পবিত্র বেলাদাত ও প্রথম অহী নাযেলের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ বা ইনতিকাল উপলক্ষে শোক পালন করার কথা উল্লেখ করেন নি। যদি করতেন, তাহলে আমরা তা পালন করতাম। সুতরাং একই দিনে ও একই তারিখে নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম এবং ইনতিকাল হলেও মৃত্যুদিবস পালন করা যাবে না, এছাড়া তিনি একই দিনে জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ ও করেন নি।  এটাই কোরআন-হাদীসের শিক্ষা।

তৃতীয় উত্তরঃ

নবীজী তো সশরীরে হায়াতুন্নবী। হায়াতুন্নবীর আবার মৃত্যুদিবস হয় কি করে? কেউ কি জীবিত পিতার মৃত্যু দিবস পালন করে? আসলে ওরা কোনটাই পালন করার পক্ষে নয়। শুধু ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) পালনকারীদেরকে ঘায়েল করার লক্ষ্যেই এইসব শয়তানী কুটতর্কের অবতারণা করে থাকে। ওরা শয়তানের প্রতিনিধি। আমরা কোরআন নাযিলের আনন্দ উৎসব করি শবে ক্বদরে এবং নবীজীর আগমনের আনন্দ উৎসব পালন করি ১২ই রবিউল আউয়ালে। ওরা কোনটাই পালন করার পক্ষপাতি নয়। আমরা সূরা ইউনুছের ৮৫নং আয়াতের নির্দেশ পালন করি।

ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন উপলক্ষে জুলুছ বা মিছিল বের করা

নবী করিম (সঃ) যখন ভূমিষ্ঠ হন- তখন এমন কতিপয় আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছিল- যা সচরাচর দেখা যায় না। প্রথম ঘটনাটি স্বয়ং বিবি আমেনা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন এভাবে-

যখন আমার প্রসব ব্যথা শুরু হয়, তখন ঘরে আমি প্রায় একা ছিলাম এবং আমার শ্বশুর আবদুল মোত্তালিব ছিলেন কা’বা ঘরে তাওয়াফরত। আমি দেখতে পেলাম, একটি সাদা পাখির ডানা আমার কলিজায় কি যেনো মালিশ করে দিচ্ছে। এতে আমার ভয়ভীতি ও ব্যথা বেদনা দূরিভূত হয়ে গেল। এরপর দেখতে পেলাম এক গ্লাস শ্বেতশুভ্র শরবত আমার সামনে। আমি ঐ শরবতটুকু পান করে ফেললাম। অতঃপর একটি ঊর্ধ্বগামী নূর আমাকে আচ্ছাদিত করে ফেললো। এ অবস্থায় দেখতে পেলাম- আবদে মোনাফ (কোরাইশ) বংশের মহিলাদের চেহারা বিশিষ্ট এবং খেজুর বৃক্ষের ন্যায় দীর্ঘাঙ্গিনী অনেক মহিলা আমাকে বেষ্টন করে বসে আছেন। আমি সাহায্যের জন্য ‘ওয়া গাওয়াছা’ বলে তাদের উদ্দেশ্যে বললাম- আপনারা কোথা হতে আমার বিষয় অবগত হলেন? উত্তরে তাঁদের একজন বললেন- আমি ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া। আরেকজন বললেন- আমি ইমরান তনয়া বিবি মরিয়ম এবং আমাদের সঙ্গিনীগণ হচ্ছেন বেহেস্তী হুর। আমি আরও দেখতে পেলাম- অনেক পুরুষবেশী লোক শূন্যে দণ্ডায়মান রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের হাতে রয়েছে রূপার পাত্র। আরও দেখতে পেলাম- একদল পাখি আমার ঘরের কোঠা ঢেকে ফেলেছে। আল্লাহ তায়ালা আমার চোখের সামনের সকল পর্দা অপসারণ করে দিলেন এবং আমি পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম সব দেখতে পেলাম। আরও দেখতে পেলাম- তিনটি পতাকা। একটি পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তে স্থাপিত, অন্যটি পশ্চিম প্রান্তে এবং তৃতীয়টি স্থাপিত কাবাঘরের ছাদে। এমতাবস্থায় প্রসব বেদনার চূড়ান্ত পর্যায়ে আমার প্রিয় সন্তান হযরত মোহাম্মদ (দঃ) ভূমিষ্ঠ হলেন

— হযরত ইবনে আব্বাস সূত্রে মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া

খাছায়েছে কোবরা ও তারিখুল খামীছ গ্রন্থে যথাক্রমে আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতি (রহঃ) এবং আল্লামা আবু বকর দিয়ারবিকরী (রহঃ) বিবি আমেনা (রাঃ)-এর একটি বর্ণনা এভাবে লিপিবদ্ধ করেছেনঃ

বিবি আমেনা বলেন-

যখন আমার প্রিয় পুত্র ভূমিষ্ঠ হলেন, তখন আমি দেখতে পেলাম- তিনি সিজদায় পড়ে আছেন। তারপর মাথা ঊর্ধ্বগামী করে শাহাদাৎ অঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করে বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় পাঠ করেছেন “আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্নি রাসুলুল্লাহ

— যিকরে জামীল সূত্রে

উপরোক্ত বর্ণনায় কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হলোঃ

(১) নবী করিম (দঃ)-এর পবিত্র বেলাদত উপলক্ষে বেহেস্তে ও আকাশ হতে পবিত্র নারী ও হুর ফিরিস্তাগণ জুলুছ করে বিবি আমেনার (রাঃ) কুটিরে আগমন করেছিলেন এবং নবীজীর সম্মানার্থে দণ্ডায়মান হয়ে কিয়াম করেছিলেন। আর ফিরিস্তাদের হয়ে এই জুলুছ ছিল আকাশ ছোঁয়া জুলুছ। তাই আমরাও নবীজীর সম্মানে কিয়াম করি ও জুলুছ করি।

(২) নবী করিম (সঃ)-এর নূরের আলোতে বিবি আমেনা (রাঃ) পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত অবলোকন করেছিলেন। যাদের অন্তরে নবীজীর নূর বিদ্যমান, সেসব অলীগণেরও দিব্যদৃষ্টি খুলে যায়। তাঁরা লাওহে মাহফুযও দেখতে পান (মসনবী শরীফ)।

(৩) নবী করিম (সঃ)-এর জন্ম উপলক্ষে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান আলো ও পতাকা দ্বারা সজ্জিত করা উত্তম। ইহা আল্লাহ ও ফিরিস্তাদের সুন্নাত।

(৪) কোরআন নাযিলের ৪০ বছর পূর্বেই নবী করিম (সঃ) কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি আদর্শ- ‘কালেমা ও নামাজ’ বাস্তবায়ন করেছিলেন। মূলতঃ থিউরিটিক্যাল কোরআন নাযিলের পূর্বেই প্র্যাকটিক্যাল কোরআন (নবী) নাযিল হয়েছিলেন। কোরআন হলো হাদিয়া- আর নবী হলেন সেই হাদিয়ার মালিক। হাদিয়া ও তার মালিকের মধ্যে যে সম্পর্ক তা সর্বজন বিদিত।

(৫) পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) উপলক্ষে জুলুছ এবং শুকরিয়ার আনন্দ মিছিল বের করা ফিরিস্তাদেরই অনুকরণ (আনওয়ারে আফতাবে সাদাকাত)। মাওয়াহেব গ্রন্থের বর্ণনায় আকাশ হতে জমীন পর্যন্ত ফেরেস্তাদের জুলুছ বা মিছিল পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন- “তোমরা আল্লাহর ফযল ও রহমত স্বরূপ নবীকে পেয়ে আনন্দ-উল্লাস করো”। (সূরা ইউনুছ ৫৮ আয়াতের তাফসীর, রুহুল মাআনীত)। জালালুদ্দীন সুয়ুতি তাঁর আল হাভী লিল ফাতাওয়া গ্রন্থে ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনে সব রকমের আনন্দ-উল্লাসকে বৈধ বলে উল্লেখ করেছেন।

পূর্ব যুগের জুলুছ

প্রাচীনকালে ১০৯৫-১১২১ খ্রিস্টাব্দে মিশরে ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) উপলক্ষে ধর্মীয় জুলুছ বের করা হতো। গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এতে অংশ নিতেন। উযির আফযলের যুগে এ আনন্দ মিছিল বের করা হতো। এ সময় রাজপথসমূহ লোকে লোকারণ্য হয়ে যেতো। পরবর্তীতে এ উৎসবের প্রসার ঘটে আফ্রিকার অন্যান্য শহরে, ইউরোপের স্পেনে এবং ভারতবর্ষে। (মাকরিজী, ইবনে খাল্লেকান)

সুতরাং যারা জশনে জুলুছকে নূতন প্রথা, শিরক ও বিদ্আত বলে- তারা অতীত ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এবং ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে মূর্খ। নবীবিদ্বেষ তাদেরকে অন্ধ করে রেখেছে। জশনে জুলুছ বের করা কোরআনী আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত।

মিলাদুন্নবী উৎসব যুগে যুগে

নবী করিম (সঃ) নবুয়ত পরবর্তীকালে নিজেই সাহাবীদেরকে নিয়ে নিজের মিলাদ পড়েছেন এবং নিজ জীবনী আলোচনা করেছেন। যেমন- হযরত ইরবায ইবনে ছারিয়া (রাঃ) একদিন নবী করিম (সঃ) কে তাঁর আদি বৃত্তান্ত বর্ণনা করার জন্য আরয করলে নবী করিম (সঃ) এরশাদ করেন-

আমি তখনই নবী ছিলাম- যখন আদম (আঃ)-এর দেহের উপাদান-মাটি ও পানি পৃথক পৃথক অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ আদম সৃষ্টির পূর্বেই আমি নবী হিসেবে মনোনীত ছিলাম। আমাকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) দোয়া করে তাঁর বংশে এনেছেন- সুতরাং আমি তাঁর দোয়ার ফসল। হযরত ঈছা (আঃ) তাঁর উম্মতের নিকট আমার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তাঁরা উভয়েই আমার সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত ছিলেন। আমার আম্মা বিবি আমেনা আমার প্রসবকালীন সময়ে যে নূর তাঁর গর্ভ হতে প্রকাশ পেয়ে সুদূর সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত করতে দেখেছিলেন- আমিই সেই নূর

— মিশকাত

এভাবে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) খলিফা চতুষ্টয় নিজ নিজ খেলাফত যুগেও নবীজীর পবিত্র বেলাদত শরীফ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল করতেন এবং মিলাদের ফযিলত বর্ণনা করতেন বলে মক্কা শরীফের তৎকালীন (৯৭৪হিঃ) বিজ্ঞ মুজতাহিদ আলেম আল্লামা ইবনে হাজার হায়তামী (রহঃ) স্বীয় রচিত “আন-নি’মাতুল কোবরা আলাল আলম” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

এছাড়াও অন্যান্য সাহাবী নবীজীর জীবদ্দশায় মিলাদুন্নবী মাহফিল করতেনঃ

১) হযরত আবু আমের আনসারীর (রাঃ) মিলাদ মাহফিলঃ

হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে- তিনি বলেন, আমি একদিন নবী করিম (সঃ)-এর সাথে মদিনাবাসী আবু আমেরের (রাঃ) গৃহে গমন করে দেখতে পেলাম- তিনি তাঁর সন্তানাদি ও আত্মীয় স্বজনকে একত্রিত করে নবী করিম (দঃ)-এর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কিত জন্ম বিবরণী শিক্ষা দিচ্ছেন এবং বলছেন যে, “আজই সেই পবিত্র জন্ম তারিখ”।

এই মাহফিল দেখে নবী করিম (সঃ) খুশি হয়ে তাঁকে সুসংবাদ দিলেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমার জন্য (মিলাদের কারণে) রহমতের অসংখ্য দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফিরিস্তাগণ তোমাদের সকলের জন্য মাগফিরাত কামনা করছেন”

— আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতির সাবিলুল হুদা ও আল্লামা ইবনে দাহইয়ার আত-তানভীর-৬০৪ হিঃ

২) হযরত ইবনে আব্বাছ (রাঃ) কর্তৃক মিলাদ মাহফিলঃ

একদিন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) নিজগৃহে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি উপস্থিত সাহাবীগণের নিকট নবী করিম (সঃ)-এর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কিত ঘটনাবলি বয়ান করছিলেন। শ্রোতামণ্ডলী শুনতে শুনতে মিলাদুন্নবীর আনন্দ উপভোগ করছিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও নবীজীর দরূদ পড়ছিলেন। এমন সময় নবী করিম (সঃ) সেখানে উপস্থিত হয়ে এরশাদ করলেন- “তোমাদের সকলের প্রতি আমার সুপারিশ ও শাফাআত অবধারিত হয়ে গেল।

— আদ দুররুল মুনাযযাম

৩) হযরত হাসসান (রাঃ)-এর কিয়ামসহ মিলাদঃ

সাহাবী কবি হযরত হাসসান বিন সাবিত (রাঃ) দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নবী করিম (সঃ)-এর উপস্থিতিতে তাঁর গৌরবগাঁথা পেশ করতেন এবং অন্যান্য সাহাবী সমবেত হয়ে তা শ্রবণ করতেন।

কিয়াম করে মিলাদ মাহফিলে নবী করিম (সঃ)-এর প্রশংসামূলক কবিতা ও না’ত পাঠ করা এবং সালাম পেশ করার এটাই বড় দলীল। এরূপ করা সুন্নাত এবং উত্তম বলে মক্কা-মদিনার ৯০ জন ওলামা ১২৮৬ হিজরীতে নিম্নোক্ত ফতোয়া দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রেরণ করেছেন।

হে মুসলমান ! আপনারা জেনে রাখুন যে, মিলাদুন্নবী (সঃ)-এর আলোচনা ও তাঁর শান মান বর্ণনা করা এবং ঐ মাহফিলে উপস্থিত হওয়া সবই সুন্নাত। বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসসান বিন সাবিত (রাঃ) কিয়াম অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর পক্ষে হুযুরের উপস্থিতিতে হুযুর (সঃ)-এর গৌরবগাঁথা পেশ করতেন, আর সাহাবীগণ তা শোনার জন্য একত্রিত হতেন।

— ফতোয়ায়ে হারামাঈন

একজনের কিয়ামই সকলের জন্য দলীল স্বরূপ।

হযরত হাসসান বিন সাবিত (রাঃ)-এর কিয়ামের কাছিদার অংশ বিশেষ ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ কাছিদায় তিনি রাসূল করীম (সঃ)-এর আজন্ম নির্দোষ ও নিষ্পাপ হওয়া এবং হুযুরের ইচ্ছানুযায়ী তাঁর আকৃতি বা সুরতে মোহাম্মাদী সৃষ্টির তত্ত্ব পেশ করেছেন। নবী করিম (সঃ) তাঁর এই কাছিদা শুনে দোয়া করতেন-

হে আল্লাহ! তুমি জিব্রাইলের মাধ্যমে হাসসানকে সাহায্য কর।

অর্থাৎ আমার পক্ষে আমার প্রশংসা বাক্য সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার তৌফিক দাও। এতে আমার দুশমনগণ ভালোভাবে জব্দ হবে।

৪) সুদূর অতীতে মিলাদুন্নবীর চিত্রঃ মাওয়াহিবের বর্ণনা

সুদূর অতীতকালে কীভাবে মুসলমানগণ ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করতেন- তাঁর একটি বিস্তারিত বর্ণনা আল্লামা শাহাবুদ্দীন কাসতুলানী (রহঃ) মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া কিতাবে বিধৃত করেছেন। মিলাদুন্নবী (দঃ) সমর্থক বিজ্ঞ মোহাক্বেক ওলামায়ে কেরাম এবং ফকিহগণ নিজ নিজ গ্রন্থে দলীল স্বরূপ আল্লামা কাসতুলানীর (রহঃ) এই দুর্লভ প্রমাণাদি লিপিবদ্ধ করেছেন। ঈদে মিলাদুন্নবী (সঃ) পালনকারী এবং সমর্থক ওলামা ও নবীপ্রেমিক মুসলমানদের অবগতির জন্য উক্ত মন্তব্য কোটেশন আকারে অনুবাদসহ নিম্নে পেশ করা হলো।

সমগ্র মুসলিম উম্মাহ সুদূর অতীতকাল থেকে নবী করিম (সঃ)-এর পবিত্র বেলাদত উপলক্ষে মাসব্যাপী সর্বদা মিলাদ-মাহফিল উদযাপনব করতেন। যিয়াফত প্রস্তুত করে তারা লোকদের খাওয়াতেন। মাসব্যাপী দিনগুলোতে বিভিন্ন রকমের সদকা খয়রাত করতেন এবং শরীয়তসম্মত আনন্দ উৎসব করতেন। উত্তম কাজ প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি করতেন। তাঁরা পূর্ণমাস শান-শওকতের সাথে বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠান করতেন- যার বরকতে বরাবরই তাদের উপর আল্লাহর অপার অনুগ্রহ প্রকাশ পেতো। মিলাদ মাহফিলের বৈশিষ্ট্য সমূহের মধ্যে এটা একটি পরীক্ষিত বিষয় যে, মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠানের বরকতে ঐ বছর আল্লাহর পক্ষ হতে নিরাপত্তা কায়েম থাকে এবং তড়িৎগতিতে উহা মনোবাঞ্ছা পূরণের শুভ সংবাদ বাহন করে নিয়ে আসে। অতএব- যিনি বা যারা মিলাদুন্নবী মাসের প্রতিটি রাত্রকে ঈদের রাত্রে পরিণত করে রাখবে- তাঁদের উপর আল্লাহর খাস রহমত বর্ষিত হবে

— মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া, মা ছাবাতা বিচ্ছুন্নাহ্

আবু লাহাবের খুশী ও তার শাস্তির বিরতি

প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর ছুয়াইবা নাম্নী এক দাসী তার মনিব আবু লাহাবকে এই সুসংবাদ জানায়। আবু লাহাব ভাতিজার জন্মসংবাদে খুশী হয়ে আপন দাসী ছুয়াইবাকে আযাদ করে দেয়। ৫৫ বছর পর বদরের যুদ্ধের ৭দিন পর প্লেগ রোগে আবু লাহাবের মৃত্যু হয়। আবু লাহাবের ভাই হযরত আব্বাস (রাঃ) স্বপ্নে আবু লাহাবকে দেখে নবী দুশমনির পরিণতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আবু লাহাব আফসোস করে বললো-

নরকে আমার স্থান হয়েছে। তবে নবী করিম (সঃ)-এর জন্মসংবাদে খুশী হয়ে দাসীকে শাহাদৎ অঙ্গুলীর ইশরায় আযাদ করার কারণে প্রতি সোমবার আমার কবরের আযাব হালকা হয় এবং শাহাদৎ অঙ্গুলী চুষে কিছুটা তৃষ্ণা নিবারণ করি ।

— বোখারী ও মাওয়াহেব

ইবনে জজয়ী (রহঃ) এ প্রসঙ্গে বলেন ‘আবু লাহাব নবী করিম (সঃ)-এর একজন কট্টর দুশমন-যার বিরুদ্ধে সূরা লাহাব নাযেল হয়েছে। নবীজীর (সঃ) জন্মদিনের খুশীতে যদি তার এই পুরস্কার হয়, তাহলে যে মুসলমান মিলাদুন্নবী উপলক্ষে খুশী উদযাপনব করবে এবং নবীর মহব্বতে সাধ্যমত খরচ করবে, তার পুরস্কার কী হতে পারে? আমার জীবনের শপথ করে বলছি-নিশ্চয়ই আল্লাহ জাল্লা শানুহু আপন অনুগ্রহে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন (আনওয়ারে মোহাম্মদীয়া)’।

উক্ত ছুয়াইবা নবী করিম (সঃ) কে কয়েক দিন দুধ পান করিয়েছিলেন। সেজন্য নবী করিম (দঃ) তাঁকে মা বলে সম্মান করতেন। জন্মের পর নবী করিম (দঃ) ১৬/১৭ দিন আপন মা ও ছুয়াইবার দুধ পান করেছিলেন।

চাঁদের সাথে খেলা

এ সময়ের একটি ঘটনা দেখে নবীজীর চাচা হযরত আব্বাস (রাঃ) পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আব্বাস (রাঃ) একদিন কথা প্রসঙ্গে বললেন-‘ইয়া রাসুলাল্লাহ ! আপনি যখন শিশুকালে দোলনায় ছিলেন-সেই সময়ের একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা আপনার নবুয়তের প্রমাণস্বরূপ আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম এবং এই ঘটনাই পরবর্তীকালে আমাকে আপনার ধর্মে দীক্ষিত হতে অনুপ্রাণিত করেছে বেশি। ঘটনাটি ছিল এই-‘আপনি দোলনায় শুয়ে শুয়ে আকাশের চাঁদের সাথে খেলা করছিলেন। আপনি আঙ্গুলের ইশরায় চাঁদকে যে দিকে হেলে যেতে বলতেন, চাঁদ সেদিকেই হেলে যেতো। এই ঘটনা আমাকে আকৃষ্ট করেছে’।

একথা শুনে একটু মুচকি হাসি হেসে হুযূর (সঃ) বললেন-‘চাচাজান, শুধু তাই নয়। আমি সে সময় চাঁদের সাথে কথাও বলতাম এবং চাঁদও আমার সাথে কথা বলতো। চাঁদ ছিল আমার খেলার নূরের পুতুল’ (হযরত আব্বাস (রাঃ) এর রেওয়ায়াত সূত্রে-মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া)।

খাছায়েছে কুবরা ও তারিখে খামিছ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, নবী করিম (সঃ) ভূমিষ্ঠ হয়েই কালেমা শাহাদাত অর্থাৎ তৌহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েছিলেন-

আমি চাক্ষুস সাক্ষ্য দিচ্ছি-আল্লাহ ছাড়া মাবুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রাসুল’। এটা ছিল হুযুরের দেখা সাক্ষ্য। তাই তিনি চাক্ষুস সাক্ষী।

প্রিয় নবী (সঃ) জন্মসূত্রেই নবী। ভূমিষ্ঠ হয়ে তৌহিদ ও আপন রিসালাতের সাক্ষ্যই প্রমাণ করে যে, নিজের নবুয়ত সম্পর্কে তিনি শিশুকালেই অবহিত ছিলেন। জনৈক অধ্যাপক তার সিরাতুন্নবী সংকলনে লিখেছেন-‘চল্লিশ বছরের পূর্বে তিনি জানতেন না যে, তিনি নবী হবেন। তাবে তাঁর আচার আচরণ ছিল নবীসুলভ’।

এটা তার বেদ্বীনী উক্তি এবং প্রকৃত ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, নবী (সঃ) না জেনে ও না বুঝে নিজের নবুয়তের সাক্ষ্য দেবেন-এটা কোনো বিবেকবান লোক বলতে পারে না।

বুঝা গেলো-তিনি শিশুকাল থেকেই চাঁদের খবরও রাখতেন-হাতের খেলনাকে যেদিকে ঘুরায়-সেদিকেই খেলনা ঘুরে। আরো প্রমাণিত হলো-তিনি তাওহীদ ও রিসালাতের শিক্ষা নিয়েই আগমন করেছেন। তাওহীদ ও রিসালাত সম্বলিত কালেমা পরবর্তীতে উম্মতের জন্য নাযিল হয়েছিল। কোরআনের ‘তালিমপ্রাপ্ত’ হয়েই তাঁর আগমন হয়েছিল। কোরআনের ‘তানযীল’ বা নুযুল হয়েছে পরবর্তীকালে।

বিবি হালিমার কোলে

মক্কার শরীফ খান্দানের প্রথা অনুযায়ী প্রত্যেক শিশুকেই ধাত্রী মায়ের ঘরে দুধপান ও লালন পালন করানো হতো’ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। উদ্দেশ্য ছিল’ শহরের কোলাহল এবং বহু লোকের সংমিশ্রণ থেকে দূরে রেখে একক বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় শিশুর প্রথম ভিত্তি স্থাপন করা। মক্কার অদূরে তায়েফের বনী ছকিফ ও বনি হাওয়াযেন গোত্র ছিল বিশুদ্ধ আরবি ভাষার অঞ্চল- যেমন আমাদের দেশের বিশুদ্ধ বাংলা ভাষার অঞ্চল হলো নদীয়া-শান্তিপুর। নবী করিম (সঃ)-এর বয়স যখন ১৬-১৭ দিন, তখন তায়েফের বনী ছকিফ গোত্রের হালিমা সা’দিয়া নাম্নী এক দরিদ্র মহিলা তাঁর দুধ মা হবার সৌভাগ্য লাভ করেন। কবিলার অন্যান্য মহিলার সাথে বিবি হালিমা পালক শিশু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন। কিন্তু গরিব বলে কেউ তাকে সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব দিতে ইচ্ছুক ছিল না। ইত্যবসরে অপেক্ষাকৃত সামর্থ্যবান অন্যান্য সাথী মহিলা ধনী ঘরের সন্তান সংগ্রহ করে ফেলেছে। ইয়াতিম ও গরিব বলে কেউ শিশু নবীকে গ্রহণ করল না।

এমতাবস্থায় স্বামীর সাথে পরামর্শ করে বিবি হালিমা ইয়াতীম শিশুনবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ)কে পালিত পুত্র হিসেবে গ্রহণ করতে রাজী হলেন। বিবি হালিমা রেশমী বিছানায় ঘুমন্ত শিশু নবীর বুকে হাত স্থাপন করতেই মুচকি হাসির ঝলক ছড়িয়ে শিশু নবী জেগে উঠলেন এবং বিবি হালিমার দিকে আকর্ষণীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বিবি হালিমা বলেন, ‘আমি শিশু নবীর চোখ হতে একটি নূর বের হয়ে আকাশের মহাশূন্যে মিশে যেতে প্রত্যক্ষ করলাম। আমি তাঁর কপালে চুমু খেয়ে তাঁকে কোলে তুলে নিয়ে ডান স্তনের দুধ পান করতে দিলাম। শিশু নবী তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করলেন। অতঃপর বাম স্তন থেকে দুধ পান করানোর চেষ্টা করলে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন। দুধ পানকালীন পূর্ণ সময়ই শিশুনবীর এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। কেননা, আমার কোলে আমার আপন শিশু আবদুল্লাহ তাঁর দুধ শরীক ভাই ছিল। নবী করিম (দঃ)-এর এই ইনসাফপূর্ণ ব্যবস্থা দেখে আমি অভিভূত হয়ে যেতাম’।

অন্যদের ন্যায্য হক প্রদানের নির্দেশসহ ৪০ বছর পর কোরআন নাযিল হয়। কিন্তু শিশু নবী (সঃ) কোরআন নাযিলের বহু পূর্বেই কোরআনের ইনসাফপূর্ণ সম্পদ বন্টনের নীতি বাস্তবায়িত করে বিশ্বজগতকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। নবীগণ আরেফ বিল্লাহ হয়েই জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শিশুকাল থেকেই সকলের জন্য ইনসাফের আদর্শ স্থাপন করেছেন। তাঁর পূর্ণ জীবনই আমাদের জন্য আদর্শ। কিন্তু মওদুদী পন্থী জনৈক অধ্যাপক তার রচিত ‘সিরাতুন্নবী’ সংকলনে (!) মন্তব্য করেছেন যে, ‘নবুয়তের ২৩ বছরের জিন্দেগীই কেবল আমাদের জন্য আদর্শ’। এটা তার নিজস্ব আবিষ্কার ও ইসলামের অপব্যাখ্যা এবং ইসলামী আকিদার পরিপন্থী মতবাদ। পূর্ব পৃষ্ঠায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী করিম (সঃ) ভূমিষ্ঠ হয়েই আল্লাহর তৌহিদ ও আপন রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। বুঝা গেলো- নিজের নবুয়ত সম্পর্কে তিনি পূর্ণ অবগত ছিলেন এবং তাঁর পূর্ণ জীবনই আমাদের জন্য আদর্শ।

বিবি হালেমা বলেন, ‘আমাদের অঞ্চলে তখন দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছিল। কিন্তু আল্লাহর অসীম কুদরতে আমার পালিত পুত্রের বরকতে আমাদের কোনো অভাব ছিলনা। অন্যান্য পরিবারের মেষ ও ছাগপালের দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল খাদ্যের অভাবে। কিন্তু আমাদের ছাগ ও মেষপাল দিনের শেষে ঘরে ফিরে আসতো দুধভরা স্তন নিয়ে। আমরা ঐ দুধে সকলেই তৃপ্ত হতাম। এভাবেই আমাদের অভাব দূর হয়ে গেল। প্রতিবেশীরা অধিক খাদ্যের আশায় তাদের মেষরাশি আমাদের মেষপালের সাথে একইস্থানে পাঠাতো। কিন্তু তাদের মেষপালগুলো ফিরে আসতো খালিপেটে; আর আমাদের মেষপাল আসতো ভরাপেটে স্তনভর্তি দুধ নিয়ে। আমার স্বামী এ অবস্থা দেখে বলতেন, হালিমা! ‘আমাদের এ সন্তান ভবিষ্যতে অতি উঁচুদরের মানুষ হবে’।

বিবি হালিমার চেয়ে শায়মা নবী করিম (সঃ)কে কোলে কাঁখে করে রাখতেন। সেজন্য নবী করিম (সঃ) তাঁকে আপন বোনের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা করতেন। ৮ম হিজরী সনে নবী করিম (সঃ) হুনায়ুনের যুদ্ধে বনী ছকিফ ও বনী হাওয়াযেন গোত্রের প্রায় ছয় হাজার লোককে বন্দী করেন। এমতাবস্থায় শায়মা লাঠিতে ভর করে নিজের বংশের বন্দীদের জন্য সুপারিশ করতে নবীজীর খেদমতে হাযির হলে তাঁকে দেখেই নবী করিম (সঃ) সসম্মানে দাঁড়িয়ে যান এবং নিজের মাথা মোবারক হতে চাদর নামিয়ে তাঁর বসার জন্য বিছিয়ে দেন। শায়মা আপন গোত্রের লোকজনের মুক্তির জন্য আবেদন জানালে নবী করিম (সঃ) নিজ অংশের বন্দীদের মুক্তি দিয়ে দেন। সাথে সাথে সাহাবীগণও তাঁদের অংশের সকল বন্দীকে মুক্ত করে দেন। এ ছিল গুরুজনদের প্রতি নবীজীর ব্যবহারের উত্তম আদর্শ। এ আদর্শ মেনে চললে শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য।

মেঘমালার ছায়াদান

শায়মা বলেন- ‘আমি আমার কোরেশী ভাইকে নিয়ে মেষ চড়াতে গেলে দেখতে পেতাম’ মরভূমির প্রখর রৌদ্রে একখণ্ড মেঘমালা তাঁকে ছায়া দিত এবং তাঁর সাথে সাথে ঘুরে বেড়াতো। যতদিন তিনি আমাদের প্রতিপালনে ছিলেন’ ততদিনই এরূপ অবস্থা ছিল’।

বিবি হালিমা বলেন- ‘শিশু অবস্থায় নবী করিম (দঃ) কাঁদতেন না। আমি একবার তাঁকে কাঁদাবার ইচ্ছায় এবং কান্নার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার বাসনায় তাঁর দু’হাত রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেই’। নবী করিম (সঃ) বলেন, ‘আমার হাতের বাঁধন শক্ত হয়ে যাওয়ায় ব্যথায় আমি কান্না করতে যাবো- এমন সময় আকাশের চাঁদ আমাকে শান্তনা দিয়ে বললো’ ‘কাঁদবেন না’। চাঁদের একথা শুনে আমি হেসে ফেললাম’। মায়ের আশা আর পূরণ হলো না (যিকরে জামিল-মুফতী শফি ওকাড়ভী)

বিবি হালিমার ঘরে নবীজী তেইশ মাস ১৩ দিন দুধ পান করে দুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। এভাবে পূর্ণ ২৪মাস বা দু’বছর দুধ পান করে তিনি দুধপান ছেড়ে দেন। ইহা কোরআনের বিধান। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী কোরআন নাযিলের বহু পূর্বেই কোরআনী বিধান বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি কোরআনী বিধানের মুখাপেক্ষী নন। তিনি মুখাপেক্ষী শুধু আল্লাহর।

তথসূত্র

  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

সুন্নি বাংলা

সুন্নি বাংলা.কম একটি সুন্নি আকিদা ভিত্তিক ইসলামী, অ-লাভজনক ওয়েব সাইট, আপনারা এখানে সুন্নি আকিদা বিরোধী, রাজনৈতিক, যৌন সম্পর্কিত যে কোন বিষয় ছাড়া সকল প্রকার বিজ্ঞাপন দেয়া যাবে। এছাড়া ইসলাম সম্পর্কিত বিভিন্ন ভাষায় রচিত বই সমূহ এখানে বাংলা অনুবাদ আকারে পাওয়া যাবে যা আপনারা ফ্রি ডাউনলোড করতে পারবেন এবং আমাদের কাছ থেকে বইয়ের আসল কপি ক্রয় করে সংগ্রহ করতে পারবেন।

2 Responses

  1. আল হাদি says:

    এটা কেমন কথা,, প্রত্যেকটা জায়গা (সঃ) এর জায়গা (দঃ) এত বড় ভুল হলে চলে,,! আল্লাহ মাফ করুক

    • সম্মানিত আল হাদি, আপনার পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ, আপনার দৃষ্টিগোচর হওয়া ভুলগুলো আমরা ঠিক করে দিয়েছি, অনাকাক্ষিত ভুলের জন্য দুঃখিত, আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ
      সুন্নিবাংলা.কম

%d bloggers like this: