গাউসুল আজম হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রঃ)- এর জীবনী

Description

গাউসুল আজম হযরত

আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ)

‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম’ বা ‘গিয়ারবী শরীফ’ :

ওলীকুলের শ্রেষ্ঠ, কুতুবে রব্বানী, মাহবুবে সোবহানী গাওসুল আজম হযরত মুহিনুদ্দিন আবদুল কাদের জিলানী (র.)-এর ওফাত দিবস হিসেবে পরিচিত এই পবিত্র দিবসটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ উপমহাদেশের প্রায় সর্বত্র যথাযথ মর্যাদা সহকারে উদযাপিত হয়ে থাকে। তারই প্রবর্তিত কাদেরিয়া তরিকাপন্থী কোটি কোটি মুসলমানের নিকট দিবসটির তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। তরিকতের ইমাম মহান সাধক হযরত গাওসুল আজমের রূহানী, আধ্যাত্মিক, ভক্ত-অনুসারীর প্রাণপ্রিয় এই ‘বড় পীর’ দুনিয়াময় ইসলামের যে আলোক শিখা জ্বালিয়ে গেছেন তা অনন্তকাল অনির্বাণ থাকবে।

বংশধারা :

গাওসুল আযম হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র.) মা-বাবা উভয় দিক থেকে ছিলেন হাসানী-হোসাইনী অর্থাৎ হযরত আলী (র.)-এর বংশধর। তিনি হিজরী ৪৭০ সালের ১ রমজান মোতাবেক ১০৭৭-৭৮ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরী ৫৬০-৬১ সাল মোতাবেক ১১৬৬ খৃস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৯০-৯১ বছর। বাগদাদে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। কোরআন তফসীর, হাদীস, ফেকাহ, বালাগত (অলংকার শাস্ত্র, সাহিত্য), ইতিহাস অংকশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা প্রভৃতি প্রচলিত সব বিষয়ে সনদ লাভ করেন। তিনি যুগ শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে এবং শরিয়ত ও তরিকতের অনন্য সাধারণ ইমাম হিসেবে এবং ইসলামের পূর্ণজীবনদানকারী হিসেবে সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন ছিলেন।

ওফাত দিবস :

হযরত গাওসুল আজমের ওফাত দিবস ‘ফাতেহা-ইয়াজদহম’ বা ‘গিয়ারভী শরীফের’ প্রথমোক্ত নামটি অধিক পরিচিত এবং সূচনা কাল থেকেই এখানে প্রচলিত। দিবসটির উদ্ভব ও প্রচলন সম্পর্কে কিছু চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়, যার নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করার অবকাশ থাকলেও দিবসটির ব্যাপক জনপ্রিয়তা সর্বজন স্বীকৃত। মুসলিম বিশ্বের আওলিয়ায়ে কেরামের ইতিহাসে গাওসুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জীলানী (র.)-এর স্থান নিঃসন্দেহে সকলের ঊর্ধ্বে। এখানে তার ওফাত দিবস নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা যাক।

হযরত গাওসুল আজম হিজরী ৫৬১ সালের রবিউস সানী মাসে ওফাত পান। খ্রিস্ট সাল অনুযায়ী যা ছিল ১১৬৬ সাল, তারিখ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ৮, ৯, ১১, ১৩ এবং ১৭ পর্যন্ত এ পাঁচটি তারিখের উল্লেখ পাওয়া গেলেও সর্বসম্মত মত হচ্ছে ১১ রবিউস সানী। ফারসি ভাষায় ১১ কে ইয়াজদহম এবং উর্দুতে ‘গিয়াবা’ বলা হয়। এবং গিয়াবা থেকে ‘গিয়ারভী’ শরীফের উৎপত্তি। দুটি নামের প্রচলন করে থেকে এবং কীভাবে শুরু হয় সে সম্বন্ধে কিছুটা মতভেদ দেখা যায়। কেউ কেউ বলেন, হযরত বড় পীর সাহেব নিজেই এটা পালন করতেন। আবার কেউ কেউ বলেন, এটা তার ওরস দিবস যা তার ইন্তেকালের পর মাসায়েখ ও ভক্ত-অনুসারীগণ পালন করতে আরম্ভ করেন। প্রথম মতের সমর্থন পাওয়া যায় আল্লামা ইমাম ইয়াফেযী কাদেরী (র.)-এর বক্তব্য হতে। আল্লামা ইয়াফেযী (র.) বলেন, ‘ফাতেহা ইয়াজদহম’ হযরত রাসূলে করীম (স.)-এর ওফাত দিবস, যা বড় পীর সাহেব তার জীবনে পালন করতে থাকেন। এ সম্বন্ধে আল্লামা ইয়াফেযী তার বিখ্যাত পুস্তক ‘কোরবাতুন নাজেরা’-তে বলেছেন, একদা বড় পীর সাহেবের ‘গিয়ারভী’ শরীফের আলোচনা হতে থাকলে তিনি (পুস্তক রচয়িতা) বলেন, এর নিয়ম এই যে, বড় পীর সাহেব রবিউস সানী মাসের ১৩ তারিখে হুজুর (স.)-এর ‘খতম শরীফ’ নির্ধারিত করে দেয়া হয়। তারপর অন্যরাও তার অনুকরণে একাদশ তারিখে হযরত রাসূলে করীম (স.)-এর নামে খতম পড়াতে আরম্ভ করেন। ক্রমশ এটা হযরত বড় পীর সাহেবের ‘গিয়ারভী শরীফ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এখন তার ওরসও একাদশ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ তার ওফাত সর্বসম্মতভাবে ১১ রবিউস সানী দিবসে।

উল্লেখিত বিবরণে একটা খটকা থেকে যাচ্ছে যে, প্রচলিত প্রথা অনুসারে কারো মৃত্যুর পর চল্লিশতম দিবসকে ফারসিতে ‘চেহলাম’ বলা হয়। বর্ণিত বক্তব্যে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ‘চেহলাম’ ১১ রবিউস সানী কিভাবে সঠিক হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ওফাত দিবস ১২ রবিউল আউয়াল হতে হিসাব করা হলে চেহলাম বা চল্লিশ পূর্ণ হতে গোটা রবিউস সানী শেষ করে পরবর্তী জমাদিউল আউয়াল মাসেরও তিন দিন হিসাব করতে হয়। পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত ৯ রবিউল আউয়াল ধরা হলে রবিউস সানী মাসের ১১ তারিখ পর্যন্ত ৪০ দিন হয় যদি রবিউল আউয়ালকে ৩০ দিন ধরা হয়। তা হলে প্রশ্ন আসে বড় পীর সাহেব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই কথিত চেহলাম কোন তারিখ হতে হিসাব করতেন? নির্ভরযোগ্য ইতিহাস সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা হওয়া আবশ্যক। আর বড় পীর সাহেবের ওফাত দিবসকে ‘গিয়ারভী’ শরীফ বা ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম যাই বলা হোক না কেন তাতে কোনো বিতর্কের সুযোগ থাকে না এবং রাসূলুল্লাহ (স.)-এর চেহলাম হিসাব করার প্রশ্নও আসে না, যা এক নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের (আলমগীর) ওস্তাদ এবং নূরুল আনোয়ার নামক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা মোল্লা জুযুনের ছেলে মোল্লা মোহাম্মদ তার পুস্তকে লিখেছেন যে, অন্যান্য মাসায়েখের ওরশ বছর শেষে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু হযরত বড় পীর সাহেবের এটা এমন একটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শান যে, বুজুর্গানে দ্বীন কর্তৃক তার ওরস গিয়ারভী শরীফ প্রতি মাসে নির্ধারিত করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে (সরকারিভাবে ও) বছরে একবার রবিউস সানী ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম বহুকাল থেকেই উদযাপিত হয়ে থাকে।
হযরত শেখ আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলবী (র.) যার যুগ হিজরী ৯৫৮ থেকে ১০৫২ সাল পর্যন্ত তিনি ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম সম্পর্কে যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশন করেছেন তা উল্লেখ করা যেতে পারে। ‘মা সাবাতা বিস সুনাহ’ নামক বিখ্যাত পুস্তকে হযরত মোহাদ্দেস দেহলবী ‘রবিউস সানী’ মাসের আলোচনা করতে গিয়ে গাওসুল আজমের ওরস সম্পর্কে লিখেছেন : ‘জানা নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে গাওসুল আজমের ওরস ৯ রবিউস সানী তারিখে হওয়া উচিত এবং পীর-মুর্শিদ শেখ আবদুল ওহাব কাদেরী মোত্তাকী মক্কী (র.) এই তারিখকে তার ওরস বলে গণ্য করতেন। ওরসের এই তারিখটাই নির্ভরযোগ্য এ কারণে যে, আমাদের পীর-মুর্শিদ শেখ আজম আলী মোত্তাকী (র.) এবং মাসায়েখের নিকট এই তারিখই নির্ভরযোগ্য। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে ১১ রবিউস সানী তারিখই অধিক প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত এবং ভারতে (পাকিস্তানে) অবস্থানরত গাওসুল আজমের বংশধর ও মাসায়েখে কেরাম একাদশ তারিখে ওরস করে থাকেন।
হযরত মোহাদ্দেস সাহেব শেখ হামেদ হাসানী জালানীর বরাত দিয়ে আরও উল্লেখ করেছেন যে, তিনি তার পিতৃ পুরুষদের মুখে শোনা কথা অনুযায়ী গওসুল আজমের ওরস একাদশ তারিখ লিখেছেন। মোহাদ্দেস সাহেব ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম বা ‘গিয়ারভী শরীফ’ অর্থাৎ এই তারিখে ওরস অনুষ্ঠান করার স্বপক্ষে তার পীর-মুর্শিদের যুক্তির কথা উল্লেখ করেন। এই দিবসের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, রাসূলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি দরূদ শরীফ ও সালাম, অধিক পরিমাণে কালেমা পাঠ, জিকির-আজকার ও খানাপিনা এবং মিষ্টি বিতরণ ও ইসালে সওয়াব ইত্যাদি অনুষ্ঠান পালন।

চারিত্রিক গুণাবলী :

হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র.)-এর চারিত্রিক গুণাবলী, ধর্মীয় আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তার অবিস্মরণীয় অবদান ইসলামের প্রচার-প্রসার সমাজের উন্নয়ন-সংস্কার, বেদাত-কুসংস্কার উচ্ছেদে তার বৈপ্লবিক ভূমিকা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য দিক। তার কারামত বা অলৌকিক ক্ষমতার অসংখ্য কাহিনীর কথা জানা যায়। তার অসংখ্য মূল্যবান ভাষণ-বাণী, গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী, ফতোয়া প্রভৃতির কথা বলে শেষ করা যাবে না। তিনি হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী হলেও মাজহাব চতুষ্টয় অনুযায়ী ফতোয়া প্রদান করতেন, যা তার নিরপেক্ষ উদার নীতিরই পরিচয় বহন করে।

প্রসঙ্গক্রমে এখানে বিস্ময়ের সাথে একটি কথা বলতে হচ্ছে যে, মহান সাধক গাওসুল আজম হযরত আবদুল কাদের জীলানী (র.) সম্পর্কে কোনো কোনো ভক্ত লেখক এমন সব আজগুবী উদ্ভট তথ্য পরিবেশন করেছেন যা নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণ করা কঠিন। উদাহরণ স্বরূপ এখানে আমরা এমন একটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই যা তার ব্যক্তি, পারিবারিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। বাংলা ভাষায় রচিত তার জীবন চরিত্র সংক্রান্ত কোনো কোনো পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চার স্ত্রী হতে তার পুত্র কন্যার সংখ্যা এত অধিক ছিল যা উল্লেখ করতে লজ্জিত হতে হয়। তবে বাগদাদ হতে প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য আরবী পুস্তকে পুত্র সংখ্যা ১২ এবং কন্যা সংখ্যা ১ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সঠিকভাবে যাচাই অনুসন্ধান না করে অলীক-অবিশ্বাস সংখ্যা প্রদান করে বস্তুত এই মহান সাধকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয়, অবমাননা করারই শামিল। আমরা যে আরবী পুস্তকটির কথা উল্লেখ করেছি তার নাম জামেউল ইমাম আল আজম। এটির লেখক হযরত ইমাম আজম আবু হানিফা (র.)-এর নামে প্রতিষ্ঠিত জামে মসজিদ এর মসজিদের প্রথম ইমাম শেখ হাসেম আল আজমী এবং জামে শেখ আবদুল কাদের জীলানী (র.)-এর সাবেক খতীব। পুস্তকটি ইরাকে ওয়াকফ ও ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৯৮০ সালে প্রকাশিত। এতে ইমাম আজম ও গাওসুল আজমসহ অনেক ইমাম-মাশায়েখ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় নিদর্শন, কীর্তি ও মসজিদের নিদর্শন স্থান পেয়েছে। গাওসুল আজমের সন্তানাদির সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। এইভাবে ‘ওয়াল্লাহ ইসনা আশারা ওলাদান ওয়া বিনতুন ওয়াহেদাহ’ অর্থাৎ তার ১২ পুত্র ও এক কন্যা (পৃ. ১১৭)। আর আমাদের দেশের অনির্ভরযোগ্য কোনো কোনো বই-পুস্তকে পুত্র-কন্যার সমষ্টিগত ৪৯ থেকে ৮২ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে, কি বিস্ময়কর অলীক?

এই পুস্তকে এমন একটি নতুন তথ্য পরিবেশিত হয়েছে, যা সঠিক হলে হযরত গাওসুল আজমের মহান বাবার আপেলের ঘটনাটি বিতর্কিত হয়ে পড়ে। আপেল বাগানের মালিক হযরত সৈয়দ আবদুল্লাহ সাওমায়ী এবং গাওসুল আজমের মহান বাবা শেখ আবু সালেহ মুসার মধ্যে বিনা অনুমতিতে আপেল খাওয়া সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ঘটনাটি অবিকল হযরত ইমাম আজম আবু হানিফা (র.)-এর মহান বাবা সাবেত আবু নোমান সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখিত জামে ইমাম আজম পুস্তকে ‘কিচ্ছাতুন লিল ওয়ালেদ’ (বাবার কাহিনী)-শিরোনামে একই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তবে এখানে বাগানের মালিক আবদুল্লাহ সাওমায়ীর নাম উল্লেখ করার পরিবর্তে ‘শাহবুশ শাহারা’কে গাছের মালিক বলা হয়েছে এবং শাবেত আবু নোমানের সাথে আবদুল্লাহ সাওমায়ীর কন্যার বিবাহ পর্যন্ত এর বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ গাওসুল আজম ও ইমাম আজমের দু’মহান বাবার একই ঘটনার একটি নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ইমাম আজমের বাবার এ কাহিনী আলোচ্য পুস্তকের ১৯ ও ২৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে। বস্তুত, আপেলের ঘটনার বিবরণ এক ও অভিন্ন মনে হলেও মনে হয় লেখক শেখ হাশেম আজমী গাওসুল আজমের বাবাকে ইমাম আজমের বাবা মনে করার ভ্রমে পতিত হয়েছেন অথবা দুটি ঘটনাই ভিন্ন ভিন্ন। অথচ ইমাম আজমের যুগ ৮০-১৫০ হিজরী পর্যন্ত। দুই ইমাম বাবার সাথে একই ঘটনা ঘটতেই পারে না যুগের এ কয়েক শতকের বিশাল ব্যবধান তারই অস্পষ্ট প্রমাণ। এতদ্ব্যতীত হযরত ইমাম আজমের জীবন চরিত্রের ওপর রচিত বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্য গ্রন্থ-পুস্তকে আপেলের উল্লেখিত ঘটনাটির উল্লেখ আছে বলে মনে হয় না। আল্লামা শিবলী নোমানীর মতো সূক্ষ্মবিদ গবেষক লেখকও ঘটনাটি সম্পর্কে কিছুই বলেননি। তার ভাষ্যনুযায়ী, সাবেতের জীবনবৃত্তান্ত অজ্ঞাত। বিভিন্ন উপায়ে এতটুকু অবগত হওয়া যায় যে, তিনি বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবনযাপন করতেন। চল্লিশ বছর বয়সে আল্লাহ তাকে সন্তান দান করেন। বাবা-মা তার নাম রাখেন নোমান। পরবর্তীকালে তিনি ইমাম আজম উপাধি লাভ করেন। (সীরাতুন নোমান)
গাওছুল আযম হযরত আবদুল কাদের জীলানী (রহ.) একই সঙ্গে শরীয়ত ও তরীকতের মহান সাধক ছিলেন। তাঁর আরবী ভাষায় রচিত কাসীদা-ই-গওসিয়া তাঁর রুহানী ক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পবিত্র কোরআন ও মহানবী (স.)-এর সুন্নাহ ছিল তাঁর মহান আদর্শ। তাঁর মূল্যবান বাণী চিরন্তন পাঠে প্রমাণিত, শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণ ব্যতীত তরীকত লাভ করা যায় না। তাঁর হাতে হাজার হাজার ইহুদী-খ্রিস্টান, মোশরেক তথা বিধর্মী মুসলমান হয়ে যায়।

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন মানব জাতির হেদায়তের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। আর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে এ ধারাবাহিকতার পরিসমাপ্তি ঘটলেও হেদায়তের দ্বার সদা উম্মোচিত ছিল, কখনও বন্ধ হয়নি। আওলাদে রাসূল, আউলিয়ায়ে কেরাম ও সত্যিকার নায়েবে রাসূল ওলামাগণ কাল-কালান্তরে হেদায়তের প্রজ্জ্বলিত এ মশালকে সদা অনির্বাণ রাখার জন্য সচেষ্ট ছিলেন এবং আছেন। পাশাপাশি মহান আল্লাহ্ এ দ্বীনের সংস্কারের জন্য প্রতি শতাব্দীতে একজন করে মুজাদ্দিদ বা দ্বীনের সংস্কারকও প্রেরণ করে থাকেন, রাসূল-এ পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা‘আলা এ উম্মতের জন্য প্রতি শতাব্দীর শুরুতে এমন একজন মহান ব্যক্তিকে প্রেরণ করেন যিনি এ দ্বীনের সংস্কার করবেন। [তিরমিযী]

গাউসুল আযম আবু মুহাম্মদ মহিউদ্দিন, শেখ সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি কেবল দ্বীনের সংস্কারক ছিলেন না বরং ইসলাম বা দ্বীনে ইসলামের একজন পুনরুজ্জীবনকারীও ছিলেন। তাই তিনি ‘মুহিউদ্দিন’ বা দ্বীনের পুনরুজ্জীবনকারী হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
কারণ তিনি এমন এক যুগ সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হন যখন ভিন্নধর্মী দর্শন মুসলিম শিক্ষা ও চিন্তার জগতকে দারুণভাবে বিভ্রান্তির কালো থাবা বিস্তার করে ফেলছিল। শিরক, কুফর ও বিদআত নিত্য নবরূপে সঞ্চারিত হচ্ছিল মুসলিম মননে। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। তাওহীদ ও রিসালতের পথ থেকে কেউ কেউ ছিটকে পড়ার উপক্রম হচ্ছিল।
অন্যদিকে খ্রিস্টান জগত তদানীন্তন মুসলিম দুনিয়াকে ধ্বংস করার জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সেই সময় উম্মতে মুহাম্মদীকে সঠিক পথের দিশা দেবার জন্য তাঁর মত একজন মুজাদ্দিদের, একজন পথ প্রদর্শকের, একজন মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হওয়া খুবই জরুরি হয়ে পড়েছিল। একজন মহান গাউস, একজন গাউসুল আজম, একজন দ্বীনকে পুনর্জীবিতকারী তথা মুহিউদ্দীন হয়ে তিনি আবির্ভূত হলেন। এমনি সময়ে হযরত বড়পীর সঠিক ইসলামের পথে মানুষকে ডাক দিয়েছিলেন তাই তিনি ‘মুহিউদ্দীন’ উপাধিতে ভূষিত হন।

হযরত গাউসে পাক এ উপাধি সম্পর্কে বলেন, ৫১১ হিজরিতে জুমার দিন আমি যখন সফর থেকে বাগদাদে প্রবেশ করছিলাম তখন খুবই দুর্বল, অসুস্থ ও বিকৃত চেহারার এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে গমন করছিলাম এমন সময় সে আমাকে ‘‘আস্সালামু আলইকা, হে আবদুল কাদের’ বলে সালাম দিল, আমিও তার সালামের উত্তর দিলাম। তখন সে বলল, আমাকে একটু উঠে বসতে সাহায্য কর। আমি যখন তাকে বসানোর জন্য তার গায়ে হাত দিলাম, দেখলাম হঠাৎ সে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ, সবল ও সমুজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে গেল, এতে আমি বিচলিত হয়ে গেলাম। তখন সে আমাকে বলল, ভয়ের কোন কারণ নেই, মূলত আমি আপনার প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র রেখে যাওয়া যাওয়া দ্বীন-ইসলাম, যা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের অপেক্ষা করছিল। আল্লাহ্ তা‘আলা আপনার মাধ্যমে আমাকে নতুন জীবন দান করেছেন, তাই আজ থেকে আপনি ‘মুহিউদ্দিন’ পরক্ষণে আমি যখন বাগদাদের জামে মসজিদের নিকটবর্তী হলাম তখন এক ব্যক্তি আমাকে ‘হে হযরত মুহিউদ্দিন’ বলে সম্বোধন করল। জুমার নামাজ শেষে ‘হে হযরত মুহিউদ্দীন’ ‘হে হযরত মুহিউদ্দীন’ বলতে বলতে দলে দলে লোক এসে আমার হাত চুম্বন করতে লাগলো। অথচ এর পূর্বে কেউ কখনও আমাকে এ উপাধিতে সম্বোধন করেনি। [বাহজাতুল আসরার, কালায়েদুল জাওয়াহের ও মাজহারী জামালে মুস্তফায়ী]

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘‘প্রত্যেকে তাই করবে যে জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।’’[বুখারী]

‘‘যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সে কাজকে সহজ করে দেয়া হয়েছে। [বুখারী]

বিভিন্ন মানুষকে নানা ধরনের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আর হযরত গাউসে পাককে সৃষ্টি করা হয়েছে এ দ্বীনের মহান খেদমত আনজাম দেয়ার জন্যে, যা তাঁর শৈশবকাল থেকেই, বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। তিনি নিজেই বলছেন, আমি ছোট বেলায় হাল-চাষ করার জন্য যখন গরুর পিঠে হাত রাখলাম তখন গরুটি পিছন ফিরে আমাকে বলল, ‘‘হে আবদুল কাদের তোমাকে তো চাষাবাদ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি।” তিনি আরও বলেন, ‘‘যখন আমি বাচ্চাদের সাথে খেলতে চাইতাম তখন অদৃশ্য থেকে কেউ আমাকে ডেকে বললেন, ‘‘হে বরকতময়, আমার দিকে এসো’’। [ক্বালায়েদুল জাওয়াহের]
এভাবে মাতৃগর্ভে ১৮ পারা কোরআন হিফজ, জন্মের পরক্ষণ থেকেই রোজা পালন করা ইত্যাদি প্রমাণ করে আল্লাহ্ পাক তাঁকে সৃষ্টির পেছনে এক মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিহিত রেখেছেন। যা তাঁর পরবর্তী জীবনে হুবহু প্রতিফলিত হয়।

জন্ম :

হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি জন্মগ্রহণ করেন ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ মুতাবিক ৪৭০ হিজরীর রমযান মাসের ১ তারিখ সেহরির ওয়াক্তে পারস্যের কাম্পিায়ান সাগরের দক্ষিণ উপকূলে জিলান বা গীলান অঞ্চলের নায়ক মহল্লায় হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বংশধারায় এক ঐতিহ্যবাহী সৈয়দ পরিবারে। তাঁর আম্মা সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতিমা রহমাতুল্লাহি আলায়হিও ছিলেন হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বংশধারার এক ঐতিহ্যবাহী সৈয়দ পরিবারের কন্যা।
গাউসুল আযম রহমাতুল্লাহি আলায়হির আব্বা সৈয়দ আবু সালিহ মূসা জঙ্গীদুস্ত ছিলেন সে যুগের একজন বিখ্যাত সূফী এবং আম্মাজানও ছিলেন মশহুর হাফিজা ও আবিদা।

শিক্ষা :

শৈশবেই আবদুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি পিতৃহারা হন। অতি শৈশবেই তিনি কুরআন শরীফ হিফজ করেন। বিভিন্ন বর্ণনা মতে তিনি মাতৃগর্ভে থাকাকালেই ১৮ পারা কুরআন শরীফ হিফজ থাকার কারণে কুরআন মজীদ কণ্ঠস্থ করে ফেলেন। এটা প্রকাশ পায় তখন যখন ৪ বছর বয়সে তাঁকে আম্মাজান একজন ক্বারীর কাছে কুরআন মজীদ শিক্ষা গ্রহণের জন্য পাঠান। কিন্তু শিক্ষক ও আশপাশের লোকজন যখন দেখলেন যে, অতটুকু শিশু বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলার সাথে সাথে একনাগাড়ে সূরা ফাতিহা থেকে ১৮ পারা পর্যন্ত মুখস্থ তিলাওয়াত করছে তখন সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। এ খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ তাঁকে দেখবার জন্য ভিড় করলেন এবং সবাই বলাবলি করতে লাগলেন, এ শিশু সাধারণ কোন শিশু নয়, নিশ্চয়ই এ শিশু একজন মশহুর আল্লাহর ওলী হবেন।

তিনি মায়ের কাছ থেকে প্রাথমিক দ্বীনী শিক্ষা গ্রহণ করে জিলান নগরীর এক মাদরাসায় অধ্যয়ন করেন। তাঁর আম্মা ছেলেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য বাগদাদ পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। বাগদাদ তখন মুসলিম খিলাফতের রাজধানী। বাগদাদের ‘নিযামিয়া মাদরাসা’ ছিল তদানীন্তন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়।
বাগদাদ এসে তিনি সেকালের শ্রেষ্ঠ আলিম ফকীহ্ ও মুহাদ্দিসদের সান্নিধ্যে থেকে ইলমে জাহিরের তাবত বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করলেন। তিনি ইলমে তাসাওউফে সর্বোচ্চ কামালাত হাসিল করলেন। তিনি প্রথমে ইলমে তাসাওফের তা’লীম গ্রহণ করেন বিখ্যাত সূফী হযরত আবুল খায়ের মুহাম্মদ হাম্মাদ আদ্দাব্বাস রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে। হযরত আবুল খায়ের মুহাম্মদ আদ্দাব্বাস তাঁর রুহানী শক্তির ঔজ্জ্বল্য অবলোকন করে মন্তব্য করেন যে, তিনি এক সময় সর্বশ্রেষ্ঠ সূফী হবেন।

হযরত আবদুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি পরবর্তীকালে তাসাওউফের সামগ্রিক জ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করার স্বীকৃতিস্বরূপ সূফী হযরত শায়খ আবূ সাঈদ মুখররিমী রহমাতুল্লাহি আলায়হির কাছ থেকে সনদপত্র বা খিলাফতনামা প্রাপ্ত হন। ইতোমধ্যেই শ্রেষ্ঠ আলিম হিসেবে, শ্রেষ্ঠ সূফী হিসেবে, শ্রেষ্ঠ ফকীহ হিসেবে তাঁর নাম বিদ্যুৎ বেগে ছড়িয়ে পড়ে মুসলিম দুনিয়ায়। বহু লোক তাঁর দরবারে এসে ভিড় জমাতে থাকে। লোকজনের ভিড় দিনকে দিন বাড়তেই লাগল।
একদিন স্বপ্নে সরকারে দো’আলম নূরে মুজাস্সম প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ওয়ায করে মানুষকে সৎপথের দিশা দেয়ার নির্দেশ দিলেন। এরপর থেকে তিনি সপ্তাহে তিনদিন ওয়ায-মাহফিলের আয়োজন করতেন।

তাঁর ওয়ায শোনার জন্য সর্বস্তরের মানুষ দলে দলে এসে সমবেত হতো। তিনি অতি দক্ষ বাগ্মী ছিলেন। লোকজন তাঁর মধুর বাণী এবং সুমিষ্ট ওয়ায ঘন্টর পর ঘন্টা মোহিত হয়ে শুনত। তাঁর ওয়াযে এমন এক মোহনীয় শক্তি ছিল যা শুনে সবাই লাভবান হতো।
গাউসুল আযম রহমাতুল্লাহি আলায়হি আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য, কামালাতের উচ্চ মাকামে উন্নীত হবার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন, এমন কি জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে মুরাকাবা-মুশাহাদারত হন। তিনি এই সময় খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দেন, এমনকি গাছের পাতা খেয়ে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণ করেন। জানা যায়, অনেক বছর তিনি বাগদাদ শরীফের বাইরে একটা টিলার উপর একটা জীর্ণ কুটিরে অবস্থান করে ইবাদত বন্দেগির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন।

 

 

ইসলাম প্রচারে অবদান :

বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে সুফিয়ায়ে কেরামের ভূমিকা সর্বজনবিধিত। তাঁরা তাঁদের উন্নত চরিত্র, উদার ভাবধারায় এত সহজে মানুষের অন্তরকে জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা শক্তি ও তলোয়ারের মাধ্যমে সম্ভব হয়নি ও হবেও না।

মানবজাতির হেদায়তের ক্ষেত্রে তাদের দু’টি দিক সর্বাধিক প্রণিধানযোগ্য। একদিকে আদর্শ, উন্নত চরিত্র, উদারতা, সর্বসাধারণের সাথে মেলামেশা, বিন¤্র মনোভাব, উত্তম মুয়ামালা ইত্যাদিতে তাঁরা ছিলেন অদ্বিতীয়, ফলে তাঁরা খুব সহজে খুব দূরের মানুষকে কাছে আনতে এবং শত্রুকেও বশ করতে সক্ষম ছিলেন। যেমনটি দেখা যায় হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির জীবনে।

অন্যদিকে তাঁদের ওয়াজ-নসিহতের মাহফিল ও বৈঠক, যাতে মুসলিম ও অমুসলিম সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল উম্মুক্ত। ফলে তাঁদের আলোচনা দ্বারা মানুষের জীবনে এক আমুল পরিবর্তন পরিলক্ষিত হতো। আর তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি। প্রাথমিকভাবে মজলিস আরম্ভ হয়েছিল দুই তিন জনকে নিয়ে, কিন্তু তাঁর মধুরবাণী ও সুমিষ্ট ওয়াজ-নসিহতে মানুষ বিমুগ্ধ হয়ে দলে দলে লোক আসতে শুরু হলো। এমনকি তাঁর এক একটি মজলিসে সত্তর হাজারেরও অধিক মানুষ অংশগ্রহণ করতো। তাঁর মাদরাসায় বসার জায়গা সংকুলান হচ্ছিলনা বিধায় বাগদাদের মহাসড়কে তাঁকে ওয়াজ-নসিহত করতে হতো। এভাবে তিনি দীর্ঘ ৩৩ বছর মানুষকে হেদায়ত করেন। ‘ফলে তাঁর এমন কোনও মজলিস ছিলনা যেখানে অসংখ্য বিধর্মী ইসলাম গ্রহণ করতো না। পাশাপাশি অসংখ্য ডাকাত, খুনি, পাপাচারী ও অপরাধীতো আছেই যাঁরা তাঁর হাতে তাওবা করে, সঠিক পথে ফিরে আসতো। [বাহজাতুল আসরার, পৃ. ৯]

আল্লাহ্ তায়ালা প্রদত্ত এ অনুগ্রহের কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন এবং বলেছেন ‘‘আমার হাতে পাঁচ হাজারেরও অধিক ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান ইসলাম গ্রহণ করেছেন।’’ [বাহজাতুল আসরার, পৃ. ৮]

গবেষক জামালুদ্দিন ফালেহ্ জিলানী তাঁর ‘ইমাম আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি নামক কিতাবে লিখেছেন সবচেয়ে প্রাচীনতম তরিকা হলো কাদেরিয়া তরিকা। এ তরিকার প্রবর্তকের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো তিনি এমন একটি প্রজন্ম গঠনে মহান ভূমিকা রেখেছেন যারা বাইতুল মুকাদ্দাস শরীফকে খ্রিস্টান দখলদারমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এ কাদেরিয়া তরিকার অনুসারীদের অন্যতম ছিলেন বিম্ববিজয়ী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, আবদুল কাদের জাজায়েরী, ওমর মুখতার, জেনারেল আবদুর রহমান, রফিক আলী আল জিলানীসহ এ উম্মতের গৌরব করার মত আরও অনেকেই।

হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি শুধুমাত্র উন্নত আদর্শ, উদারতা, মানবপ্রেম, ওয়াজ নসিহত ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করেননি বরং বিশ্বব্যাপী ইসলামের আলো বিতরণ করার জন্য তাঁর খলীফা, মুরিদ ও শিষ্যদের নিয়ে এমন একটি জামাত গঠন করেন যারা দ্বীনের দাওয়াতের উদ্দেশ্যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েন। যাঁদের হাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের একটি দল হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি জীবদ্দশায় ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেন।

হযরত আবদুল কাদের জীলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হির সরাসরি খলিফা হলেন হযরত বাবা আদম শহীদ রহমাতুল্লাহি আলায়হি, যিনি বড়পীর সাহেবের জীবদ্দশায় এবং তাঁরই নির্দেশে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং বাংলাদেশেই শাহাদত বরণ করেন। তিনিই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম খানকায়ে কাদেরিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। অনুরূপভাবে হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ রহমাতুল্লাহি আলায়হি যিনি গাউসে পাকের পৌত্র (নাতী) ছিলেন, রাজশাহীতে ইসলাম প্রচার করেন।
অধ্যাডক ড. হাসান ইব্রাহীম হাসান তাঁর রচিত ‘ইনতেশারুল ইসলাম ফিল ক্বাররাহ্ আল আফরিকীয়্যাহ্’ গ্রন্থে বলেন, ‘আফ্রিকা মহাদেশে ইসলাম প্রচারে যে তরিকার অবদান সবচেয়ে বেশি তা হলো তরীকায়ে কাদেরিয়া। অনুরূপভাবে ড. আবদুর রহমান জাকী তাঁর রচিত ‘আল মুসলেমুনা ফি আল আলাম আল ইয়াউম’ নামক কিতাবে একই মন্তব্য করেন। মাসিক আল ইসলাম ওয়াত তাসাউফ (জানুয়ারি ১৯৬১) তার রিপোর্ট উল্লেখ করেছে সোমালিয়াতে সর্বপ্রথম যে তরিকাটি প্রবেশ করে সেটি হলো কাদেরিয়া তরিকা। ফরাসী প্রাচ্য গবেষক ফানসান মুনতাই ১৯৫৭ সালের ১৩ জানুয়ারি মরক্কোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে লিখিত প্রবন্ধে বলেন, ‘চীনের ইনান নামক প্রদেশে একটি মাজার দেখা যায় যার ফলকে লিখা আছে। আবদুর রাজ্জাক বাগদাদির নাম, যিনি দ্বাদশ খ্রিস্টীয় শতাব্দীতে চীনে ইন্তেকাল করেন। যিনি ছিলেন হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হির পৌত্র (নাতী) এবং চীনে সর্বপ্রথম ইসলাম প্রচারকারী।’’

হেলী কারবার দানকোচ বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের কোকাজের মুসলমানগণ এখনও হানাফী মাযহাব এবং কাদেরিয়া তরিকার অনুসারী-কমিউনিউজিয়ামের শাসন ক্ষমতা সত্ত্বেও তাঁদেরকে তাঁদের ঘরে কাদেরিয়া তরিকার ওয়াজিফা পাঠ করতে শুনেছি।

বিশ্বজুড়ে কাদিরিয়া তরিকা :

শরীয়ত তরীকত হাক্বীকত ও মা’রিফাতের সমন্বয়ে যে ইলম সম্বলিত ও বিকশিত হয়েছে তাকে বলা হয় ‘ইলমে তাসাওউফ’ বা তাসাওউফ বিজ্ঞান। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই এলমে তাসাওউফ চর্চা সূচিত হয়েছে।

কুরআন মজীদে যে তাযকীইয়ায়ে নফস এবং হাদীস শরীফে যে ইহসানের কথা বলা হয়েছে সেটাই মূলতঃ তাসাওউফের দিকনির্দেশনা প্রদান করে। তাসাওউফ চর্চায় বিভিন্ন পদ্ধতি কালক্রমে কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিন্যাসিত হয়েছে যেগুলো ত্বরীকা নামে পরিচিত। কাদেরিয়া তরিকা তরিকাসমূহের মধ্যে বহুল প্রচলিত।
তিনি ইলমে তাসাওউফ তথা শরীয়ত, তরীক্বত ও হাক্বীক্বত ও মা’রিফাতের সমন্বয়ে বিন্যাসিত ইসলামের এ অনন্য বিজ্ঞানকে আরও সহজে চর্চার সুবিধার্থে এক আলোচিত ধারার পদ্ধতি বিন্যাস করেন। এটা কাদেরিয়া তরীকা নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি ইলমে তাসাওফের আলখেল্লা পরা তাঁর কালের সমস্ত বাতিল ফিকাগুলোকে চিহ্ণিত করে তাদের সান্নিধ্যে না যাবার জন্য আহ্বান জানান। তিনি কি কি কারণে ঐ সমস্ত ফিরকাগুলো বাতিল তাও উল্লেখ করে পুস্তক লিখে তা জনগণের মধ্যে প্রচার করেন।

ইলমে তাসাওউফে যে সমস্ত তরীকা রয়েছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ তরীক্বা হিসেবে বিবেচিত হয় গাউসুল আযম কর্তৃক বিন্যাসকৃত কাদেরিয়া তরিকা। এ তরিকার বিস্তৃতি ঘটেছে বিশ্বের নানা দেশে ব্যাপকভাবে, যা অন্য সব তরীকার ক্ষেত্রে দেখা যায় না। যে কারণে গাউসুল আযমের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে প্রসারিত হয়েছে। কাদেরিয়া তরিকা অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহু খানকা গড়ে উঠেছে।

কাদেরিয়া তরিকা প্রসারিত হয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র। এটাই শ্রেষ্ঠ তরিকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সারা পৃথিবীতে কাদেরিয়া তরিকার নিসবত বা সম্বন্ধ অনুযায়ী অসংখ্য খানকা শরীফ রয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশে প্রায় সবগুলো দেশে বিশেষ করে মিসর, লিবিয়া, সুদান, নাইজার, নাইজিরিয়া, মালী, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মৌরিতানিয়া প্রভৃতি দেশে এই তরীকার ব্যাপক চর্চা রয়েছে। এশিয়া মহাদেশে এবং ইউরোপ ও আমেরিকাতেও এর চর্চা রয়েছে। বাংলাদেশে কাদেরিয়া তরিকার সূচনা হযরত শাহ্ জালাল রহমাতুল্লাহি আলায়হির মাধ্যমে।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে কাদেরিয়া তরিকা :

বাংলাদেশে কাদেরিয়া তরিকার প্রভাব ব্যাপকভাবে রয়েছে। যতদূর জানা যায় হযরত শাহ্ জালাল রহমাতুল্লাহি আলায়হি রাজশাহীর শাহ্ মাখদুম রহমাতুল্লাহি আলায়হি, পশ্চিম বাংলার হযরত মনসূর বাগদাদী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এ অঞ্চলে এ তরীকার ব্যাপক প্রসার ঘটান।

বাবা আদম শহীদ রহমাতুল্লাহি আলায়হি

যে ক’জন প্রখ্যাত সুফি সাধক ইসলাম প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে বাবা আদম রহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন অন্যতম শক্তিশালী আধ্যাত্মিক ওলি। ভারতে মধ্যযুগে যে ক’জন সুফি দরবেশ ইসলাম প্রচারের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন বাবা আদম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বাবা আদম শহীদ রহমাতুল্লাহি আলায়হি ১১৪২ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম প্রচারে উদ্দেশ্যে ১২ জন আরবীয় নাগরিক নিয়ে বাণিজ্য জাহাজযোগে চট্টগ্রাম পৌঁছান।

খোরাসান প্রদেশে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর বাবা আদম রহমাতুল্লাহি আলায়হি উচ্চ শিক্ষার জন্য বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। নিজামিয়া মাদরাসা থেকে উচ্চ শিক্ষালাভের পর তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য বাগদাদে হযরত আবদুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হির সাহচর্যে আসেন এবং তাসাওফের শেষ স্তর অতিক্রম করেন।

তিনি প্রথমে মহাস্থানগড়ে খানকায়ে কাদেরিয়া স্থাপন করে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। কয়েকবার সম্মুখ ও নৌ-যুদ্ধ হয়েছিল বাবা আদমের সঙ্গে বল্লাল সেনের। ১১৭৪ সালে বিক্রমপুরে বাবা আদম শহীদ হন। শহীদ হওয়ার পর তাকে রিকাবী বাজার দীঘিরপাড় সড়কের পাশে দাফন করা হয়।

হযরত শাহ্ মাখদুম রূপোশ রহমাতুল্লাহি আলায়হি

রাজশাহীতে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে যাদের নাম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে হযরত শাহ্ মাখদুম রূপোশ রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাদের অন্যতম। ওলীকুল শিরোমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হির প্রিয়তম পৌত্র হযরত শাহ্ মাখদুম রূপোশ ছিলেন সে মহান সাধক যিনি রাজশাহীর মত অনগ্রসর স্থানে ইসলামের মহান বাণী প্রচার করে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করেছিলেন। তৎকালীন মহাকালগড়ে (বর্তমানে রাজশাহী) দেও রাজাদের অন্যায়-অনাচার, অবিচার ও নানা কুসংস্কার মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। বিশেষ করে মানুষ বলি দেয়ার মত নিষ্ঠুর কাজে জনগণ ছিল অতিষ্ঠ। আল্লাহ্ তায়ালার অশেষ মেহেরবাণীতে হযরত শাহ্ মাখদুম রূপোশ রহমাতুল্লাহি আলায়হি এ অঞ্চলের মানুষকে পাপ-পঙ্কিলতা ও অত্যাচার থেকে মুক্ত করে শান্তির নগর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তাঁর নাম শাহ্ মাখদুম জালাল উদ্দীন রূপোশ। অন্যত্র তাঁর নাম আব্দুল কুদ্দুস জালালুদ্দীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামী বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, ‘তাঁর নাম সায়্যিদ আবদুল কুদ্দুস। শাহ্ মাখদুম রূপোশ নামে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ‘শাহ্’ মাখদুম, ‘রূপোশ’ এগুলো তাঁর লকব বা উপাধি।
হযরত শাহ্ মাখদুম রূপোশ রহমাতুল্লাহি আলায়হি ৬১৫ হিজরির ২ রজব মোতাবেক ১২০৮ খৃস্টাব্দে বাগদাদ নগরীতে পিতৃগ্রহে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত আযাল্লাহ্ শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি। হযরত আযাল্লাহ্ শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হির ২৭ পুত্রের একজন। হযরত শাহ্ মাখদুম রূপোশ রহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন আযাল্লাহ্ শাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হির দ্বিতীয় পুত্র।

হযরত সায়্যিদুনা আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একটি নাম, যাঁর কারামত জন্মলগ্ন থেকে একে একে বিকশিত হয়েছে। যা কিনা মুসলমানদের উপলব্ধির বিষয়। নিম্নে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় প্রকাশ হওয়া কারামাতসমূহ বর্ণনা করা হল।

জন্মঃ হযরত সায়্যিদুনা আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ৪৭০হিজরীতে (১০৭৫খ্রিষ্টাব্দ) পবিত্র রমজান মাসের জুমার দিন এই ধরণীতে তাশরীফ আনেন। “মানাকেবে মিরাজিয়া” নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্মকালীন তাঁর চেহারা প্রতিভাত হচ্ছিল যেন চন্দ্রের কিরণ। মনে হয়েছিল সমগ্র ঘর উদ্ভাসিত হয়ে গেছে চাঁদের আলোয়।

তাঁর আব্বাজানের নাম হযরত আবু ছালেহ মূসা জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং তাঁর আম্মাজানের নাম হযরত উম্মুল খায়ের ফাতিমা রহমাতুল্লাহি আলাইহা। তাঁরা উভয়ই ছরকারে মদীনা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশধর অর্থাৎ একজন হাসান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং অন্যজন হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর পবিত্র বংশধর। এ জন্য “আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খাঁ বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত “হাদায়েক্বে বখশীশ” কাব্যগ্রন্থে’ সুন্দর বলেছেন –

“আপনি কেন হাসানী এবং হুসাইনী আর মহিউদ্দীন হবেন না?

যেহেতু আপনার বংশধারা দুই সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে।”

হযরত সৈয়্যদ আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি যখন দুনিয়ার বুকে তশরীফ আনেন তখন তাঁর আম্মাজানের বয়স ছিল ষাট। যে বয়সে সাধারণত মহিলাদের গর্ভধারণের ক্ষমতা লোপ পায়। এটাও গাউছে পাকের এক বৈশিষ্ট্যের কারণে যা আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে পেয়েছেন।

হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মানুষের কাছে মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রাব্বানী, গাউসুল আজম, গাউসুস সাক্বলাঈন, মহিউদ্দীন এবং সায়্যিদুল আউলিয়া হিসেবে পরিচিত। হযরত আল্লামা আবদুর রহমান জামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন –

“আঁ শাহ্-এ-ছরফরাজ কে গাউসুস সাক্বলাঈন আস্ত”

অর্থাৎ – তিনিই উচ্চ মর্যাদাবান বাদশাহ্ যিনি গাউসুস সাক্বলাঈন নামে জগতে পরিচিত।

মানাকেবে গাউসিয়া নামক কিতাবে শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন – হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় গায়েব হতে পাঁচটি আজিমুশ্শান কারামত প্রকাশ পেয়েছে।

(১) যে রাত্রিতে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্ম লাভ করেন ঐ রাতে তাঁর সম্মানিত আব্বাজান আবু ছালেহ মূসা জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহি স্বপ্নে দেখলেন যে, সরওয়ারে কায়েনাত, ফখরে মওজুদাত, আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে তাঁর ঘরে তশরীফ আনলেন এবং ঐ ঘরে সমস্ত ইমাম ও আউলিয়ায়ে কেরাম উপস্থিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসা জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে সম্বোধন করলেন-

“হে আবু ছালেহ! আল্লাহ্ তায়ালা তোমাকে এমন এক সন্তান দান করেছেন যিনি অলিকুল শিরোমনি এবং আমার সন্তান। সে আমার এবং আল্লাহর বন্ধু। অচিরেই তাঁর মর্যাদা অলিদের এবং কুতুবদের মধ্যে এমন হবে যেমন আমার মর্যাদা অন্যান্য নবীদের উপর।”

কবি সুন্দর বলেছেন-

গাউসে আজম দরমিয়ানে আউলিয়া

চুঁ জনাবে মুস্তফা দর আম্বিয়া।

অর্থাৎ,নবীগণের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে ফজিলত, গাউসে পাকেরও অন্যান্য অলিদের উপর সেই ফজিলত।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বাণীর দিকে ইঙ্গিত করে আ’লা হযরত বলেন –

জো অলী কব্‌ল থে ইয়া বা’দ হুয়ে ইয়া হোঙ্গে

ছব আদব রাখতে হ্যাঁয় দিল মে মেরে আক্বা তেরা।

অর্থাৎ, যে সমস্ত অলি গাউসে পাকের আগে এবং পরে হয়েছেন সবাই তাঁদের অন্তরে আমার গাউসে পাকের মুহাব্বত রাখেন।

(২) গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় দেখা গেল তাঁর কাঁধ মোবারকের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র কদম শরীফ (অর্থাৎ পদ চিন্‌হু‎) ছিল। যা তাঁর অলীয়ে কামিল হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল বহন করে।

(৩) গাউসে পাকের পিতাকে আল্লাহ্ তায়ালা স্বপ্নে সুসংবাদ দিলেন যে, তোমার যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে তিনি সমস্ত অলিদের বাদশাহ্ হবেন। যারা তাঁর বিরোধিতা করবে তারা পথভ্রষ্ট এবং ধর্মহারা হবে।

(৪) যে রাতে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্ম গ্রহণ করেন সে রাতে জিলান শহরের যে সমস্ত মহিলা সন্তান প্রসব করেন তারা সবাই আল্লাহর ইচ্ছায় ছেলে সন্তানের জন্ম দেন এবং পরবর্তীতে সেসব ছেলে সন্তান আল্লাহর অলী হয়েছেন।

(৫) গাউসে পাকের জন্ম মাস ছিল রমজানুল মোবারক। তিনি সে দিন থেকে রোযা রাখা আরম্ভ করলেন। সেহ্‌রী থেকে ইফতারের পূর্ব সময় পর্যন্ত কিছুই খেতেন না। তাঁর সম্মানিত পিতা বর্ণনা করেন- আমার সন্তান যখন দুনিয়ার মধ্যে তশরীফ আনেন তখন রমজান মাস ছিল। সারা দিন দুধ পান করতেন না। তাঁর জন্মের দ্বিতীয় বৎসরে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় রমজানের চাঁদ দেখা যায়নি। তাই লোকজন আমার ঘরে এসে এ ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তখন আমি তাদেরকে বললাম- আমার আবদুল কাদের আজ দুধ পান করেনি । এরপর তৎকালীন ইমামগণ ঐক্যমতে পৌঁছলেন যে, নিশ্চয়ই আজ রমজানের দিন।

গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কিছুদিন পর তাঁর প্রিয় পিতাকে হারান। সে সময় তাঁর প্রিয় নানা তাঁর কর্তৃত্বের ভার নেন। তাঁর নানা ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত বুজুর্গ ব্যক্তি। তিনি তাঁর পবিত্র নাতিকে অলিয়ে কামেল করার জন্য দোয়া করলেন।

ছোটবেলা থেকে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু খেলাধুলা থেকে বিরত থাকতেন। অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জীবন যাপন করতেন। অতিরিক্ত কথাবার্তায় বলতেন না। গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন – আমি যখন অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলা করার ইচ্ছা করতাম তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন অদৃশ্যে থেকে বলতেন – হে আবদুল কাদের! খেলাধুলা থেকে বিরত থাক। – (খোলাছাতুল মফাহির)

বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি পড়ার উপযুক্ত হলেন, তখন তাঁকে মক্তবে ভর্তি করানো হয়েছিল কোরআনুল করীম পড়ার জন্য। উস্তাদের সামনে তিনি নম্রতার সাথে বসলেন, উস্তাদ বললেন- পড়ূন! “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম” । তিনি বিসমিল্লাহ্ এর সাথে সূরা বাক্বারার শুরু থেকে পড়তে আরম্ভ করেন। উস্তাদ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কী ব্যাপার? তিনি উত্তর দিলেন হে প্রিয় উস্তাদ, আমিতো এই কোরআন আমার মায়ের মুখে মুখে গর্ভাবস্থায় শিখেছি (সুবহানাল্লাহ্)।

হুজুর গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন- আমি যখন মাদ্রাসায় যেতাম তখন এক ফেরেশতা আমার সাথে থাকতেন এবং আমাকে দিক নির্দেশনা দিতেন।-(কালায়েদে জাওহার)

হুজুর গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন – এক ফেরেশতা আমার সাথে সাথে চলতে চলতে গন্তব্য স্থানে গিয়ে বলেন- হে লোকেরা আল্লাহর অলীর জন্য জায়গা করে দিন যাতে তিনি বসতে পারেন। অন্যান্য ফেরেশ্তা ঐ ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি কে? ফেরেশতাটি জবাবে বলেন- তিনি হলেন অলীদের সরদার। -(বাহজাতুল আসরার)

হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জিলানের এক মকতবে অধ্যয়নরত ছিলেন। ইত্যবসরে তাঁর কফিল (অভিবাভক) নানাজান ইহজগৎ ত্যাগ করেন। তখন তাঁর সম্পূর্ণ দায় -দায়িত্ব বর্তায় তাঁর আম্মাজানের উপর। একদিন তিনি রাস্তা দিয়ে হাটছিলেন । হঠাৎ আওয়াজ এল – “মা লিহাজা খুলিক্বতা ওয়ালা বিহাজা উমিরতা” অর্থাৎ হে আবদুল কাদের ! আপনাকে এজন্য সৃজন করা হয়নি। কথা শুনার পর তাঁর অন্তরে আল্লাহর মুহাব্বত যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মত আঁছড়ে পড়ছিল । এরপর তিনি আল্লাহ্‌কে পাবার জন্য মুরাকাবা, মুশাহাদায় লিপ্ত হয়ে যান এবং নিরবিচ্ছিন্নভাবে শরীয়ত ও তরীক্বতের কাজ করার লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করেন।